তরুণদের ভরসা বালেন, নেপালের নেতৃত্বে কি নতুন অধ্যায়?

৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ নেপালের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী ও আলোচিত চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছেন , যিনি ‘বালেন’ নামেই বেশি পরিচিত। কালো চশমা, তীক্ষ্ণ ভাষা ও প্রতিবাদী গানের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়া এই সাবেক কাঠমান্ডু মেয়র এবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন।
সম্প্রতি কাঠমান্ডুতে হাজারো সমর্থকের সামনে নিজের স্বাক্ষর কালো চশমা খুলে তিনি বলেন, “আমি তোমাদের ভালোবাসি।” তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক সমর্থন ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই ভালোবাসা একতরফা নয়।
১৯৯০ সালে জন্ম নেওয়া বালেন পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ২০১৩ সালে জনপ্রিয় র্যাপ প্রতিযোগিতা ‘র’ বার্জ’-এ জয়ী হয়ে তিনি আলোচনায় আসেন। দুর্নীতি, বৈষম্য ও সাধারণ মানুষের সংগ্রাম নিয়ে তার গান তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় ধাক্কা দেন। পরে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)-তে যোগ দেন এবং বর্তমানে দলটির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী।
আগামী ৫ মার্চের নির্বাচনে তিনি ঝাপা-৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে। অঞ্চলটি কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল)-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের সময় বালেন প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানান। যদিও অনেক তরুণ তাকে অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে সমর্থন করেন—যা এখন অনেকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন।
সামাজিক মাধ্যমে তার প্রভাব নজিরবিহীন। ফেসবুকে প্রায় ৩৫ লাখ এবং ইনস্টাগ্রামে ১০ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে তার। মূলধারার গণমাধ্যম এড়িয়ে সরাসরি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখেন তিনি।
তার গান ‘আমি নেপালকে হাসতে দেখতে চাই’ এবং ‘বালিদান’ ইউটিউবে কোটি ভিউ পেয়েছে। গত বছরের আন্দোলনে এসব গান তরুণদের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।
তবে বালেনকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে কটূক্তি করে পোস্ট দেওয়ায় তিনি সমালোচিত হয়েছেন। একবার সরকারি গাড়ি থামানোয় ক্ষুব্ধ হয়ে ‘সিংহ দরবারে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
ভারতের ‘অখণ্ড ভারত’ মানচিত্রের জবাবে নিজের দপ্তরে ‘বৃহত্তর নেপাল’ মানচিত্র টাঙানো এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন সাময়িক নিষিদ্ধ করাও কূটনৈতিক আলোচনা তৈরি করে। যদিও তার সমর্থকদের মতে, এসব পদক্ষেপ তার দৃঢ় ও আপসহীন নেতৃত্বের প্রতিফলন।
নেপালের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ ৩৫ বছরের নিচে, অথচ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন সত্তরোর্ধ্ব রাজনীতিকরা। এই প্রেক্ষাপটে বহু তরুণের কাছে বালেন ‘স্ট্যাটাস কো’ ভাঙার প্রতীক।
সমালোচকদের প্রশ্ন—তিনি কি জাতীয় নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত? মেয়র থাকাকালে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি কম হওয়া এবং একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবু প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণদের বড় অংশ তার ওপর আস্থা রাখছে। তাদের মতে, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে নতুন মুখ প্রয়োজন—আর সেই মুখ বালেন।
র্যাপার থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসা এই নেতার যাত্রা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর আসনে পৌঁছায় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
দৈএনকে/জে, আ