খামেনির মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্য অস্থির, যুদ্ধ ছড়িয়েছে ছয় দেশে

কয়েক সপ্তাহের তীব্র উত্তেজনা ও হুমকির পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানে বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান শুরু হয়েছে। একই দিনে রাজধানী তেহরানসহ একাধিক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
এই যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তেহরানে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সময় নিখুঁত হামলা চালানো হয়। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা–এর সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালিত হয় বলে জানানো হয়েছে। পরে ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাত দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। দেশ পরিচালনার জন্য প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের এক জ্যেষ্ঠ সদস্যকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে।
যৌথ হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধানসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, কয়েকজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক পাল্টা হামলা শুরু করেছে। কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকে অবস্থিত বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে তেহরান। ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং নিজেদের আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাইয়ে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইরাক ও পাকিস্তানে মার্কিন কনস্যুলেট ঘিরে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। করাচিতে সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ইরান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করেছে। ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, এই প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংঘাতের প্রথম দিনেই ইরানে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু ও শত শত আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন শহরে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের জনগণকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইরান ঘোষণা দিয়েছে, শত্রুরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত হামলা চলবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, অভিযান দীর্ঘও হতে পারে, আবার কয়েক দিনের মধ্যেও শেষ হতে পারে। ভবিষ্যতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্য এখন পূর্ণমাত্রার এক যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি। সামরিক হামলা, পাল্টা হামলা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই সংঘাত কতদূর গড়াবে এবং কূটনৈতিক সমাধানের কোনো পথ খুলবে কি না—তা এখন বিশ্ববাসীর বড় প্রশ্ন।