রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
Natun Kagoj

ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের বাহ্যিক কর্মের পাশাপাশি অন্তরের অবস্থার ওপর গভীর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই অন্তরের অবস্থার মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। নিয়ত বলতে বোঝায় কোনো কাজ করার পূর্বে অন্তরে যে উদ্দেশ্য, সংকল্প ও লক্ষ্য স্থির করা হয়। ইসলামে নিয়ত শুধু আনুষ্ঠানিক একটি বিষয় নয়; বরং প্রতিটি আমলের গ্রহণযোগ্যতা ও মূল্য নির্ধারণের প্রধান মানদণ্ড।

আরবি ‘নিয়্যাহ’ শব্দের অর্থ ইচ্ছা বা সংকল্প। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করার অন্তরের দৃঢ় সিদ্ধান্তকেই নিয়ত বলা হয়। নিয়ত মূলত অন্তরের বিষয়, এটি মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়।
নিয়তের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন
“নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৭)
এই হাদিসকে অনেক মুহাদ্দিস ইসলামের এক-তৃতীয়াংশ জ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ মানুষের ইবাদত, লেনদেন, আচরণ সবকিছুর মূল্যায়নের মূলনীতি এতে নির্ধারিত হয়েছে।
কুরআন মাজিদে সরাসরি ‘নিয়ত’ শব্দটি না এলেও একনিষ্ঠ উদ্দেশ্য ও অন্তরের অবস্থার ওপর বারবার জোর দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন
“তাদেরকে তো কেবল এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করে।”
(সুরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, ইবাদতের মূল শর্ত হলো একনিষ্ঠতা, যা নিয়তের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়।
আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন
“আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক রূপ ও সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।”
(এই মর্মে হাদিস রয়েছে, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের অন্তরের নিয়ত আল্লাহর কাছে বাহ্যিক কাজের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামের প্রতিটি ইবাদতের সঙ্গে নিয়ত অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ
সব ইবাদতের শুদ্ধতা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন
“যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখে ঈমান ও সওয়াবের আশায়, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬০)
এখানে “ঈমান ও সওয়াবের আশায়” কথাটি নিয়তের দিকেই ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ শুধু উপবাস থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য থাকতে হবে।

ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, নিয়তের মাধ্যমে দুনিয়াবি কাজও ইবাদতে পরিণত হতে পারে। কেউ যদি পরিবারকে হালাল রিজিক দেওয়ার উদ্দেশ্যে কাজ করে, তবে সেটিও ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন
“তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যা কিছু ব্যয় করো, এমনকি স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তুলে দাও, তাতেও সওয়াব রয়েছে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬)
এ হাদিস প্রমাণ করে যে, সঠিক নিয়ত থাকলে সাধারণ পারিবারিক কাজও আখিরাতের পুঁজি হয়ে ওঠে।

ইসলামে রিয়া বা লোক দেখানো আমলকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন
“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা নামাজ আদায় করে, কিন্তু তা করে লোক দেখানোর জন্য।”
(সুরা আল-মাউন, আয়াত: ৪–৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) রিয়াকে ছোট শিরক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এতে আল্লাহর ইবাদতে মানুষের সন্তুষ্টিকে শরিক করা হয়। এমন আমল আখিরাতে কোনো উপকারে আসে না।

নিয়তের পরিপূর্ণতা আসে ইখলাসের মাধ্যমে। ইখলাস মানে একমাত্র আল্লাহর জন্য কাজ করা। আল্লাহ বলেন
“বলো, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবই আল্লাহর জন্য।”
(সুরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬২)
এই আয়াত একজন মুমিনের জীবনের আদর্শ নিয়তকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

ইসলামে নিয়ত হলো আমলের প্রাণ। শুদ্ধ নিয়ত ছাড়া কোনো আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মানুষের অন্তরের উদ্দেশ্যই তার সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে। তাই একজন মুসলমানের উচিত প্রতিটি কাজের আগে নিজের নিয়ত পরিশুদ্ধ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে একমাত্র লক্ষ্য বানানো। শুদ্ধ নিয়তই দুনিয়ার সাধারণ কাজকে ইবাদতে পরিণত করে এবং আখিরাতে চিরস্থায়ী সফলতার পথ খুলে দেয়।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন