নারী যার জীবন শুধু অন্যের খুশির জন্য

একটি পরিবারের প্রতিটি হাসির আড়ালে যারা নীরবে নিজের ঘুম, স্বাস্থ্য, ইচ্ছা ও স্বপ্নকে পিছনে ঠেলে দেন—তারা হলেন নারীরা। মা, স্ত্রী, পুত্রবধূ বা কন্যা—যে পরিচয়েই হোন না কেন, পরিবার ও চারপাশের সবাইকে যত্ন নিতে গিয়ে নিজের যত্ন নেওয়াটাকেই একসময় অপরাধ মনে করতে শেখেন।
গবেষণা ও পরিসংখ্যানও এই নীরব বাস্তবতাকে প্রমাণ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার নারীরা পুরুষদের তুলনায় দৈনিক গড়ে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা বেশি গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজ করেন। তবে এই অতিরিক্ত শ্রমের জন্য তারা আর্থিক স্বীকৃতি পান না; বরং নিজেদের জন্য সময় বের করা তাঁরা ‘বিলাসিতা’ মনে করেন।
নারীর এই আত্মত্যাগ মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। পরিবারের ‘ইমোশনাল কেয়ারগিভার’ হিসেবে তারা সবার কষ্ট সহ্য করেন, কিন্তু নিজের মানসিক চাপ ও অবসাদের কথা বলার মানুষ পান না। World Health Organization–এর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ডিপ্রেশন ও অ্যানজাইটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্তদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও নারীর অবহেলা মারাত্মক। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরিবর্তে তারা অন্যদের প্রয়োজন মেটাতে ব্যস্ত থাকেন। এর ফলে অ্যানিমিয়া, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হরমোনজনিত সমস্যা বেশি দেখা যায়।
সমাজ নারীর আত্মত্যাগকে প্রশংসনীয় মনে করলেও এর প্রভাব ক্ষতিকর। গবেষকরা জানাচ্ছেন, যখন নারীর ত্যাগ বাধ্যতামূলকভাবে মহিমান্বিত হয়, তখন নারী নিজের চাহিদা প্রকাশ করতে অপরাধবোধে ভোগেন। দীর্ঘমেয়াদে এটি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নারীর নিজের যত্ন নেওয়া মানে পরিবারকে অবহেলা করা নয়। বরং সুস্থ ও মানসিকভাবে স্থির নারীই পরিবারকে ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত নিজের শারীরিক ও মানসিক যত্ন নেন—যেমন পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সামাজিক যোগাযোগ ও পছন্দের কাজ—তারা পরিবারে ইতিবাচক প্রভাব রাখেন।
পরিবারের সকলের যত্ন নিতে গিয়ে নিজের যত্ন ভুলে যাওয়া মানুষটি নারী—এটি কোনো কবিতার লাইন নয়, এটি আমাদের সমাজের কঠিন বাস্তবতা। তাই নারীর নিজের যত্ন নেওয়াকে স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। নিজেকে সময় দেওয়া মানেই পরিবারের সুখ ও সুস্থতা নিশ্চিত করা।
দৈএনকে/জে, আ