সামাজিক নিরাপত্তার নতুন সূচনা: নারীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতাই শক্তিশালী পরিবারের ভিত্তি, আর শক্তিশালী পরিবার গড়ে তোলে শক্তিশালী রাষ্ট্র—এই দর্শনকে সামনে রেখে ইলেকট্রনিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের দাবি, দারিদ্র্য দূর করতে হলে নারীর ক্ষমতায়নে রাষ্ট্রকে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবারে দারিদ্র্য কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। খাবারের নিশ্চয়তা, সন্তানের শিক্ষা কিংবা হঠাৎ অসুস্থতায় চিকিৎসার খরচ এই অনিশ্চয়তার চাপ সবচেয়ে বেশি বহন করেন নারীরা। ঝালকাঠির একটি গ্রামের রাশিদা বেগমের মতো অসংখ্য নারী নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে সংসারের ভার টেনে নেন, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা থাকে সীমিত।
এই বাস্তবতা বদলাতেই বিএনপির প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন বক্তব্যে বলেছেন, শুধু শিক্ষা নয় নারীর হাতে খাদ্যনিরাপত্তা, সঞ্চয় এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষমতা না দিলে দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যেই পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার কেন্দ্রীয় হাতিয়ার হিসেবে ফ্যামিলি কার্ডের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৩ সালে ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখার অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত এই ইলেকট্রনিক ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতিটি পরিবার মাসে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা সমমূল্যের খাদ্যসহায়তা পাবে। সহায়তা নগদ অর্থ অথবা চাল, আটা, ডাল ও ভোজ্যতেলের মতো নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্য আকারে দেওয়া হতে পারে। এতে একটি পরিবারের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদার বড় অংশ নিশ্চিত হবে বলে দাবি বিএনপির।
কর্মসূচির বিশেষ দিক হলো কার্ডটি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে। বিএনপির মতে, নারীরাই পরিবারের খরচ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বাস্তব ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। খাদ্য ব্যয় কমে গেলে সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হবে, যা দিয়ে নারী নিজেই হাঁস-মুরগি পালন, সবজি চাষ বা ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো উদ্যোগ নিতে পারবেন।
স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে প্রতিটি বিভাগে একটি করে উপজেলা নিয়ে পাইলট প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে নগদ ও খাদ্যসহায়তার কার্যকারিতা, দুর্নীতির ঝুঁকি ও প্রশাসনিক ব্যয় বিশ্লেষণ করা হবে। সফল হলে ধাপে ধাপে প্রথমে ৫০ লাখ পরিবার এবং পরে সারা দেশে কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান রাজস্ব কাঠামোর মধ্যেই ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো ও অপচয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়ের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপি বলছে, ফ্যামিলি কার্ড কোনো দয়ার কর্মসূচি নয়; এটি নারীর প্রতি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকার। সর্বজনীন বা ব্ল্যাঙ্কেট পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের ফলে এখানে তালিকা প্রণয়ন, পক্ষপাত বা বঞ্চনার সুযোগ থাকবে না। অধিকার যখন সবার জন্য সমান হয়, তখন মর্যাদাও সবার জন্য নিশ্চিত হয়।
দলটির দাবি, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি তৈরি হবে, যা আত্মনির্ভরশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
দৈএনকে/জে, আ