জাতীয় পার্টির অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান রাজনৈতিক মহলের

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত ও সমালোচিত একটি নাম—জাতীয় পার্টি। সামরিক শাসনের পর রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের প্রয়োজনে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যে দলটির জন্ম দেন, সেটিই পরবর্তীতে দেশের রাজনীতিতে এক বিশেষ অবস্থান তৈরি করে নেয়।
বন্দুকের নলের রাজনীতি থেকে বেসামরিক রূপান্তরের প্রতীক হিসেবেই দলটির সূচনা, তবে তার পরের ইতিহাসে ভাঙন, বিভাজন ও নেতৃত্বের টানাপোড়েনের গল্পই বেশি। কখনও ক্ষমতার অংশীদার, কখনও বিরোধী দলের ভূমিকায়—জাতীয় পার্টি যেন বারবার নিজের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করেছে সময়ের দাবিতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের সংকটময় সময়গুলোতে দলটি বড় কোনো আন্দোলন বা দাপুটে ভূমিকা রাখতে না পারলেও, পটপরিবর্তনের মুহূর্তে প্রভাবক হিসেবে সক্রিয় থেকেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে ‘জাপা’ নামটি উচ্চারিত হয়েছে বারবার।
অভিযোগ আছে—জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের সহায়ক ভূমিকায় ছিল দলটি। তবে দলটির নেতারা বরাবরই সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “জাতীয় পার্টি জনগণের স্বার্থে কাজ করেছে, কারও পক্ষে নয়।”
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি আবারও সামনে আসছে নতুন সমীকরণে। অনেকের মতে, এবারও তারা হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতির ‘কিং মেকার’।
গত বছরের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে অনেকটাই কোণঠাসা জাতীয় পার্টি। দাবি উঠেছে দলটিকে নিষিদ্ধের।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র আইনবিষয়ক সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, আমাদের দাবি হচ্ছে, আইনিভাবে জাতীয় পার্টির যে দায় আছে, তাদের যে অপরাধগুলো আছে, সেগুলোর জন্য তাদের বিচারের মুখোমুখি করা। যারা ফ্যাসিবাদের দোসর ছিল, যারা গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল, জনগণের সঙ্গে প্রতারণায় জড়িত ছিল—তাদেরকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে হবে।
জাতীয় পার্টি (জাপা) মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর অভিযোগ করেন, ভোটের অংকে নিজেদের এগিয়ে রাখতেই এমন আওয়াজ তুলেছে কেউ কেউ।
তিনি বলেন, নতুন যে দলগুলো আছে, বিশেষ করে গণঅধিকার বা এনিসিপি, তারা জাতীয় পর্যায়ের দল হতে পারেনি, ভোট ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ অংশে তারা অংশ নিতে পারেনি। ফলে তারা অনেকেই ভাবতে পারে, জাতীয় পার্টি ভোটে অংশগ্রহণ করলে যদি কোনো দলের সঙ্গে অ্যালায়েন্স (জোট) করে, ভোটের অনেকগুলো হিসাব এলোমেলো হয়ে যাবে। পাশাপাশি ভোট করব না, জোট করব না—এ রকম যে হুমকিগুলো দেওয়া হয়, সেই হুমকিটা তখন আর দিতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, মূলত, বিএনপিকে আঁকড়ে বা চেপে ধরার জন্য, বিএনপিকে শ্বাসরুদ্ধ করার জন্যই তারা জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে চায় অথবা ভোটে আনতে চায় না। আগে সরকারতে নিরপেক্ষ হতে হবে, নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ হতে হবে, দেশের কাঠামোকে নিরপেক্ষ হতে হবে। তখন অবশ্যই জাতীয় পার্টি ভোটে যাবে। জাতীয় পার্টি সবসময় ভোটে যেতে আগ্রহী।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে সরকার। স্থগিত আছে তাদের প্রতীকও। তবে জাতীয় পার্টির রাজনীতির বিষয়ে নেই কোন আইনি নিষেধাজ্ঞা। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. সাব্বীর আহমেদ বলেন, আপনি আ.লীগের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেবেন, জাতীয় পার্টির ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেবেন, এই দুটি ইস্যুকে যদি রাজনৈতিকভাবে সমাধান না করেন তাহলে নির্বাচন সমস্যা হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী বলেন, আইনগত কোনো ব্যবস্থা ছাড়া শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে বা তার বিরুদ্ধে তাকে কোনো কিছু থেকে বাদ দেওয়া, এগুলো করার একটা গ্রাউন্ড (ভিত্তি) থাকতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, যেহেতু এই পার্টির নিবন্ধন বাতিল হয়নি, আ.লীগের মতো তাদের কার্যক্রমটাও নিষিদ্ধ হয়নি, তাই এই মুহূর্তে তাদের নির্বাচনে আসতে আর বাধা নেই।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে গড়া দলটির নেতাদের দাবি, মোট ভোটারের অন্তত ৭ থেকে ৮ শতাংশের সমর্থন রয়েছে লাঙলের পক্ষে।