বাগেরহাটে নির্বাহী প্রকৌশলীর দুর্নীতি: পানি প্রকল্পে কোটি টাকার অনিয়ম

বাগেরহাট জেলায় সরকারি ও দাতা সংস্থার অর্থায়নে বাস্তবায়িত পানি সংরক্ষণ প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিকের বিরুদ্ধে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এক বছরের মেয়াদে শেষ হওয়ার কথা থাকা প্রকল্পগুলো তিন বছর পেরিয়ে গেলেও কার্যক্রম প্রায় শূন্য- শুধু কিছু পরিবারের মাঝে মানহীন ট্যাংকি বিতরণ করেই প্রকল্পের ৭০ ভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
বাগেরহাট জেলা জুড়ে প্রায় ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড’ ও ‘বস্তির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প’-এর আওতায় ৬ হাজার ৪৩টি পরিবারের জন্য পলিমার ট্যাংকি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিটি ট্যাংকি স্থাপনের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ যথাক্রমে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর ও ২০২৪ সালের ডিসেম্বর। কিন্তু তা অতিক্রম হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক প্রকল্পের পরিচালকের (P.D) দায়িত্বেও থাকায় তিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে কার্যাদেশ দিয়েছেন। প্রকল্পের লাইসেন্স মূলত ঠিকাদার জাহিদুর রহমান সোহেল ও মীর রহমত আলীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে যায়। তারা বাগেরহাটের সাবেক দুই সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।
প্রকল্প সম্পন্ন হলে উপকারভোগী পরিবারের কাছ থেকে সন্তুষ্টি প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার নিয়ম থাকা সত্ত্বেও জয়ন্ত মল্লিক তা ছাড়াই ঠিকাদারদের বিল প্রদান করেছেন। পলিমার ট্যাংকির গুণগত মান বা স্বাস্থ্যঝুঁকি পরীক্ষা ছাড়াই অর্থ প্রদান করা হয়েছে। অনেক ট্যাংকি নিম্নমানের এবং এতে ক্ষতিকর পদার্থ থাকতে পারে। তবু তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিল ছাড় করেছেন। এছাড়া কিছু পরিবারকে সরকারি নির্দেশ অমান্য করে নিজ খরচে ট্যাংকি আনতে বাধ্য করা হয়েছে এবং সহায়ক চাঁদার পরিবর্তে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে।
প্রকল্পের কাজের মেয়াদ শেষ হলেও ঠিকাদাররা কাজ শেষ করেননি। চারটি কিস্তিতে পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে, অথচ ৯২৩টি ট্যাংকি এখনো জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে হস্তান্তর করা হয়নি। প্রকল্পের অর্ধেক কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন জয়ন্ত মল্লিক। এই দুর্নীতির ফলে এলাকার মানুষ এখনও বিশুদ্ধ পানির সংকটের মুখে।
ঠিকাদাররা অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানিয়েছেন, প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ এবং সময়সীমা অনিশ্চয়তার কারণে তারা কাজ শেষ করতে পারছেন না। অন্যদিকে জয়ন্ত মল্লিক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। খুলনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বাহার উদ্দীন মৃধা জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রকৃত তদারকির এখতিয়ার নেই এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ার মীর আব্দুস সাহিদ বিদেশে থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গণমাধ্যমকর্মী জানান, বিষয়টি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ আকারে প্রক্রিয়াধীন। মানহীন ট্যাংকি বিতরণ, অতিরিক্ত চাঁদা আদায় ও প্রকল্পের অর্ধেক কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে কোটি টাকা আত্মসাৎ- সব মিলিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিকের অব্যাহত দুর্নীতি বাগেরহাটের পানি প্রকল্পকে ধ্বংসাত্মক অবস্থায় ফেলেছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক বলেন, এসব মিথ্যা। তাঁকে হয়রানি করতে এমন তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। নিউজ করলে তার কোন আপত্তি নাই বলেও জানান তিনি।