নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৌশলগত নেতৃত্ব জরুরি: রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উদীয়মান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় কৌশলগত নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনায় ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা অবশ্যই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে পরিচালিত হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণ সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুবিধার ভিত্তিতে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।’
আজ বঙ্গভবনে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬ এবং আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬-এর অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে মানসম্মত নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করেন। এ সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের কথাও উল্লেখ করেন।
১৯৭৭ সালে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পেশাদার সামরিক শিক্ষার প্রসারে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথাও স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং গত ১৭ বছরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারীদেরও স্মরণ করেন। জনগণের মর্যাদা রক্ষা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রচলিত নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার হুমকি, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মহামারি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা কেবল সামরিক প্রস্তুতির বিষয় নয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সতর্কতা ও দূরদর্শিতার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি যুদ্ধ এবং নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে। অন্যদিকে ভুল তথ্য, অপতথ্য ও সাইবার হুমকি জাতীয় নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৌশলগত দূরদর্শিতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা, বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার সক্ষমতাসম্পন্ন নেতৃত্ব প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ভূমিকার প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সশস্ত্র বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে সমসাময়িক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অভিন্ন উপলব্ধি গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।
ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬ ও আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬-এর অংশগ্রহণকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সবার ওপরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে পেশাদারিত্ব, সততা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বজায় রাখতে হবে।
বিদেশি অংশগ্রহণকারীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশে তাঁদের এই অভিজ্ঞতা নিজ নিজ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও জোরদার করতে ভূমিকা রাখবে।
রাষ্ট্রপতি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জাতিগুলোর মধ্যে বন্ধুত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা, মতবিরোধের পরিবর্তে সংলাপ এবং সংঘর্ষের পরিবর্তে শান্তির আহ্বান জানান।
এ ছাড়া সক্ষম ও দূরদর্শী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার জন্য ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশংসা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. ফয়জুর রহমান।
এ সময় ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ফ্যাকাল্টি সদস্য, এনডিসি ও এএফডব্লিউসি কোর্স সম্পন্নকারী সেনা কর্মকর্তারা, কোর্সে অংশ নেওয়া বিদেশি সদস্য, আর্মি স্টাফ অফিসার, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও) এবং বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬-এ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ৫৪ জন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ১৮ জন এবং ১৭টি বন্ধুপ্রতিম দেশের ৩১ জনসহ মোট ১০৩ জন অংশ নিচ্ছেন।