ট্রাম্পের গাজা নীতি নিয়ে জাতিসংঘে মাক্রোঁর কড়া বক্তব্য

গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ। তিনি বলেছেন, তথাকথিত শান্তি ঘোষণার পরও গাজায় এক মুহূর্তের জন্যও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ খোলা হয়নি। এ পরিস্থিতিকে বিশ্ববাসীর জন্য ‘চরম লজ্জার’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছর মে মাসে দায়িত্ব ছাড়ার আগে মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে ট্রাম্পের গাজা নীতি নিয়ে সমালোচনা করেন মাক্রোঁ।
একই মঞ্চে ট্রাম্প তার গাজা পরিকল্পনাকে ‘ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরার কয়েক ঘণ্টা পর মাক্রোঁ এসব মন্তব্য করেন।
মাক্রোঁ বলেন, ‘এক বছর আগে এই একই জায়গায় প্রায় ডজনখানেক দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তখন অনেকেই বলেছিলেন, স্বীকৃতি তো শুধু কাগজে-কলমে, বাস্তব পরিস্থিতির কী হবে? এখন গাজার দিকে তাকিয়ে আমাদের ভাবতে হবে, আমরা যদি এখানে নিষ্ক্রিয় থাকি, তাহলে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় থাকবে?’
তথাকথিত শান্তি উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ শান্তি প্রতিষ্ঠার বড়াই করছেন। কিন্তু সেই শান্তির পরও গাজায় এক মুহূর্তের জন্য মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ খোলা হয়নি।’
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমরা কি শুধু দর্শক হয়ে এমন একটি পরিস্থিতি দেখেই যাব? এই দৃশ্য কি আমাদের সবার জন্য লজ্জার নয়?’
মাক্রোঁর বক্তব্যের জবাবে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধ শেষ করেছেন। জীবিত সব জিম্মিকে মুক্ত করা হয়েছে এবং নিহত জিম্মিদের মরদেহও পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প এখন গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ২০ দফার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যরা যখন শুধু কথা বলছেন, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কঠিন সমস্যার সমাধানে কাজ করছেন।’
ওই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের চেয়ে বেশি কিছু আর কেউ করেনি বলেও দাবি করেন হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ফ্রান্সের অভ্যন্তরে মাক্রোঁ সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন রাজনীতিক ও অধিকারকর্মীর সমালোচনা রয়েছে। তাদের অভিযোগ, ফিলিস্তিন ইস্যুতে ফ্রান্স যথেষ্ট ভূমিকা রাখেনি।
তবে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে ফ্রান্স কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটি জাতীয় পর্যায়ে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি দখলকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি থেকে আসা পণ্য নিষিদ্ধ করার আইনি প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি তুলে ধরে মাক্রোঁ বলেন, ‘পশ্চিম তীরের দিকে তাকান। সেখানে প্রতিদিনই ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। কিন্তু এসব কার নামে হচ্ছে? হামাস তো পশ্চিম তীরে কখনো কার্যক্রম চালায়নি।’
তিনি বলেন, ‘পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তা ফিলিস্তিনি জনগণের নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।’
গত এক বছরে ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে মাক্রোঁ বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলেই ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং এতে এখন এবং ভবিষ্যতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাই আরও দুর্বল হতে পারে।’
২০১৭ সালে প্রথমবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন মাক্রোঁ। আগামী ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সাত মাস আগে এবারই শেষবারের মতো এই অধিবেশনে বক্তব্য দিলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাক্রোঁর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণও রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রতীকী উদ্যোগের প্রতি তার ঝোঁক থাকলেও সেগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অর্জনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা ও জাতিসংঘের পক্ষে মাক্রোঁ বরাবরই অবস্থান নিয়ে আসছেন।
বিশ্ব আবার ‘অসভ্য যুগে’ ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করে মাক্রোঁ বলেন, ‘এখন দেশগুলোর সামনে দুটি পথ—একটি হলো ক্ষমতার দাপট ও নিপীড়নের বিশ্ব, আরেকটি হলো সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজের পথে থাকা।’
তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো এখন আমাদের সবার দায়িত্ব। কোনো পক্ষ যদি দায়মুক্তির ওপর ভিত্তি করে নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করতে চায়, তা আমরা মেনে নিতে পারি না।’
‘জাতিসংঘ দীর্ঘজীবী হোক’—এই আহ্বান জানিয়ে ভাষণ শেষ করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।