গুমের তদন্তে স্বাধীন কমিশনের দাবি ১১ দলীয় জোটের

গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিবর্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে রাখার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোট। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ পুনর্বহাল এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলামটরে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। পরে সেখান থেকে সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা করেন জোটের নেতাকর্মী, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। সংসদের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে তারা সমাবেশ করেন এবং স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেন।
১১ দলের নেতারা অভিযোগ করেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত নতুন বিলে আগের অধ্যাদেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, গুমের অভিযোগ তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিবর্তে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ক্ষমতা দিতে হবে।
পদযাত্রায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিক, সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেনের বিরুদ্ধে গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তাদের বিচারের দাবি জানান।
পদযাত্রাটি বিকেল ৪টার দিকে কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট এলাকা অতিক্রম করার সময় ওই সড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এতে আশপাশের এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।
সংসদের সামনে ১১ দলের সমাবেশ
পদযাত্রার পর সংসদের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের প্রবেশপথের সামনে সমাবেশ করে ১১ দল। এ সময় সংসদ ও এর আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেখানে জোটের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। পুলিশ তাদের ঘিরে রাখে।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গুম প্রতিরোধের অধ্যাদেশ বাতিল করে তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেওয়া হলে নিরপেক্ষ তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তিনি আগের অধ্যাদেশ পুনর্বহালের দাবি জানান।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুই দফা গুমের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের উদ্বেগ স্পিকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
নতুন বিলে গুমের মিথ্যা অভিযোগের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখার সমালোচনা করে হাসিনুর রহমান বলেন, গুমের ঘটনা প্রমাণের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের যেন নতুন করে হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশে বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রস্তাবিত আইনগুলো মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্যকর নয়।
জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাশেম আরমান বলেন, ভবিষ্যতে যাতে কোনো নাগরিক গুমের শিকার না হন, এমন কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে হবে। গুমবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
সমাবেশে জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, এলডিপি, খেলাফত আন্দোলনসহ ১১ দলের নেতারা বক্তব্য দেন।
যে পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর দেওয়ার বিধান ছিল। পাশাপাশি কমিশনের ট্রাইব্যুনালে বিচার, সন্দেহজনক গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতার কথাও ছিল।
তবে সংসদে উত্থাপিত নতুন বিলে এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে বিরোধী দলের নেতারা দাবি করছেন। তাদের বক্তব্য, নতুন প্রস্তাবে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী ছাড়া অন্য বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী ব্যবস্থার মাধ্যমে করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিচার ট্রাইব্যুনালের পরিবর্তে জজ আদালতে করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে কারাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন এবং কমিশনের নিয়োগ বাছাই প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব কমানোর মতো কিছু বিধানও নতুন বিলে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে বিরোধী দল অভিযোগ করেছে।
তাদের দাবি, এসব পরিবর্তনের ফলে গুমের অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ কমে যাবে।
সংসদীয় কমিটির বৈঠক বর্জন
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকও বর্জন করেন বিরোধী দলের দুই সংসদ সদস্য। তারা হলেন জামায়াতের নূরুল ইসলাম ও কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন।
আব্দুল বাতেন বলেন, প্রস্তাবিত বিলটি দুর্বল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী অধ্যাদেশের কাঠামো অনুসরণ করে বিল প্রণয়ন না করায় তারা বিলটি পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন না।
তবে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, কোনো সদস্যের সংশোধনী বা মতামত থাকলে তা বৈঠকে উপস্থাপন করার সুযোগ রয়েছে। সভা থেকে ওয়াকআউট সংসদীয় রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংসদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিলটি পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য সংসদে পাঠানো হবে।
মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও আপত্তি
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনাও বর্জন করে বিরোধী দল। দলটির অভিযোগ, রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে বিলটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিরোধী দলের মুখপাত্র ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, প্রস্তাবিত বিলটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও দুর্বল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তার অভিযোগ, স্থায়ী কমিটিকে অল্প সময়ের মধ্যে বিলের প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এ কারণে বিরোধী দল বৈঠক বর্জন করেছে।
অন্যদিকে সরকারি পক্ষের বক্তব্য, প্রস্তাবিত আইনগুলো পর্যালোচনা ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের পরবর্তী কার্যক্রম এখন সংসদীয় প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।