লারাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, জর্ডানে পাল্টা হামলার দাবি ইরানের

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ লারাক দ্বীপে দুটি রকেট উৎক্ষেপণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ের শেষ দিকে সামরিক অভিযান স্থগিতের পর ইরানের ভূখণ্ডে এটিই ওয়াশিংটনের প্রথম প্রকাশ্য হামলা বলে জানা গেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে রকেটের মাধ্যমে সাগরে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। এরপর লারাক দ্বীপের দুটি রকেট উৎক্ষেপণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
সেন্টকমের মুখপাত্র কমান্ডার টিম হকিন্স মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে জানান, হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের কারণেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
লারাক দ্বীপটি ইরানের প্রধান বন্দর বান্দার আব্বাসের কাছাকাছি এবং হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ অংশের পাশে অবস্থিত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় অঞ্চলটির সামরিক তৎপরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
হতাহত ও পাল্টা জবাবের হুমকি
মার্কিন হামলার পর আইআরজিসি জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে হামলায় কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছেন। হামলার প্রতিশোধ নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, লারাক দ্বীপে হামলার জবাবে জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি।
আইআরজিসির দাবি, জর্ডানের কিং হুসেইন ও আল-আজরাক এলাকায় থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি জর্ডানের
ইরানের হামলার দাবির পর জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা হয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা পেত্রা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার ভোরে জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করা হয়। এ ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন, ইরান জলপথটিতে যেসব মাইন স্থাপন করেছিল, সেগুলোর সবই সরিয়ে ফেলা হয়েছে অথবা বিস্ফোরিত হয়েছে।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, নতুন করে কোনো জাহাজ বা নৌযান সেখানে মাইন স্থাপনের চেষ্টা করলে সেটিকে ধ্বংস করা হবে।
তবে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি এই বক্তব্যকে প্রচারণামূলক দাবি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইরানের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা ড্রোনের মাধ্যমে চালানো হয়ে থাকতে পারে। হামলায় দুজন নিহত ও দুজন আহত হওয়ার খবরও বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর এই জলপথে নৌ চলাচল কার্যত ব্যাহত হয়েছে।
সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য, তেহরানকে আরও অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়ানো।
ইরান অবশ্য এসব পদক্ষেপকে আগের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছে এবং সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার পর ওয়াশিংটন নতুন করে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে দাবি করেছে।