ঢাকাসহ তিন জেলায় নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ সেবা চালু

নারীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও যাত্রীবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঢাকাসহ তিন জেলায় বিশেষ ‘পিংক বাস’ সেবা চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপোতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সেবার উদ্বোধন করেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, নারীদের যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এই সেবার পরিধি বাড়ানো হবে। নতুন রুটে বাস চালুর পাশাপাশি বাসের সংখ্যাও বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে নারীরা বর্তমানে গণপরিবহনে যে পরিবেশে চলাচল করছেন, সেটি আরও উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, শুধু বাস চালু করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। নারী যাত্রীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে বাসে উঠতে, যাতায়াত করতে এবং গন্তব্যে নামতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সেবার মানও উন্নত করতে হবে।
বিআরটিসি জানিয়েছে, নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ এই সেবা মোট ১৪টি বাস দিয়ে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ১০টি রুটে ১০টি, চট্টগ্রামের দুটি রুটে দুটি এবং বগুড়ার দুটি রুটে দুটি বাস চলবে।
ঢাকায় চালু হওয়া ১০টি বাসের মধ্যে একটি একতলা এবং নয়টি দ্বিতল বাস রয়েছে। নারী চালক ও নারীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই সেবা চালু করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে রুট ও বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। বর্তমানে যে এলাকাগুলোতে সেবা চালু হয়েছে, তার বাইরে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ বাসসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, অতীতে বিভিন্ন সেবা জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্বোধনের পর কয়েক মাসের মধ্যেই সেগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। নতুন ‘পিংক বাস’ সেবার ক্ষেত্রে এমনটি হতে দেওয়া হবে না।
বিআরটিসি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মঙ্গলবার যে সেবা চালু হয়েছে, দুই মাস পর সেটির মান আরও উন্নত করতে হবে। নতুন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক সহায়তায় শুরুতে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তবে প্রতিদিন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করতে হবে।
নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলেও জানান মন্ত্রী। তাঁর মতে, এই উদ্যোগকে টেকসই করা, সেবার মান বাড়ানো এবং এর পরিধি বিস্তৃত করাই এখন মূল লক্ষ্য।
নারীদের যাতায়াতের পুরো প্রক্রিয়াকে নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দেন শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, বাসে ওঠার আগের অপেক্ষার সময় থেকেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক নারী বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। বাসের ভেতরেও বিভিন্ন কারণে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আবার গন্তব্যে নামার সময়ও অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপদ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ভোটারদেরও বড় একটি অংশ নারী। তাই নারীদের সক্ষমতা ও অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হলে তাদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২০০টি ইলেকট্রিক বাস সরাসরি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে ই-বাস কেনার ক্ষেত্রে অনুমোদন, দরপত্র ও আন্তর্জাতিক ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় দেড় বছর সময় লাগতে পারে। তাই দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে সরাসরি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ২০০টি ই-বাসের মধ্যে ১০০টি বিভিন্ন রুটে নারী যাত্রীদের জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বাস যুক্ত হলে নারী বাসসেবার রুট ও সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। মাল্টিমোডাল যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ইলেকট্রিক বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিআরটিসির ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর তাগিদ
বিআরটিসির বর্তমান ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী। তিনি জানান, সংস্থাটি বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বা তার বেশি বাস পরিচালনা করছে এবং বর্তমানে লোকসানে নেই; বরং ব্রেক-ইভেন অবস্থায় রয়েছে।
তবে সেবার মান ও পরিচালন ব্যবস্থায় এখনও সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরোনো ও জরাজীর্ণ ব্যবস্থাপনা থেকে বের হয়ে বিআরটিসিকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও যাত্রীবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে।
ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অনেক রুটের বাস্তবে অস্তিত্ব না থাকলেও সেসব রুটের পারমিট রয়েছে। আবার কোথাও পারমিট না থাকলেও বাস চলাচল করছে। পুরোনো রুটব্যবস্থাকে যাত্রীদের বর্তমান চাহিদা ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন করে সাজানো হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিআরটিসির চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।