মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

ঈদে মিলাদুন্নবীর সূচনা ও ইতিহাস যেভাবে

ঈদে মিলাদুন্নবীর সূচনা ও ইতিহাস যেভাবে
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মুসলিম বিশ্বের একটি বহুল আলোচিত ধর্মীয় আয়োজন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও জীবন স্মরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালন করা হয়। তবে এই আয়োজনের সূচনা কখন, কীভাবে এবং ইসলামের ইতিহাসে এর অবস্থান কী—এ নিয়ে মুসলিম আলেম ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ রয়েছে।

কেউ মনে করেন, মহানবী (সা.) নিজেই তার জন্মদিনের কথা স্মরণ করতেন। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, বর্তমান সময়ের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে মিলাদুন্নবী পালনের প্রচলন পরবর্তী সময়ে শুরু হয়েছে এবং এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগের রীতি নয়।

মহানবী (সা.)-এর জন্মদিন স্মরণ

মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে কোরআন তিলাওয়াত, নাত, জিকির, দরুদ পাঠ, আলোচনা সভা, মিষ্টি বিতরণসহ নানা আয়োজন করা হয়।

মহানবী (সা.) সোমবার রোজা রাখতেন। তাকে সোমবার রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি এই দিনকে নিজের জন্মদিন হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অনেক মুসলমান মনে করেন, নবীজি (সা.) তার জন্মের দিনটি স্মরণ করতেন।

তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রচলন কখন শুরু হয়, সে বিষয়ে ইতিহাসে একাধিক মত রয়েছে।

ফাতেমীয় আমলে মিলাদের প্রচলন

ইতিহাসের কিছু বর্ণনায় মিসরের ফাতেমীয় শাসকদের সময় মিলাদুন্নবী পালনের প্রচলনের কথা পাওয়া যায়। ৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মিসর বিজয়ের পর ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ লিদিনিল্লাহর শাসনামলে এ ধরনের আয়োজন শুরু হয়েছিল বলে কিছু ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন।

তবে সে সময়ের আয়োজন বর্তমানের মিলাদ মাহফিলের মতো ছিল না। মিষ্টি ও সদকা বিতরণ, ধর্মীয় আলোচনা এবং শোভাযাত্রার মধ্যেই আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল। বিভিন্ন প্রতিনিধি ও ধর্মীয় ব্যক্তিরা আল-আজহার মসজিদে যেতেন এবং পরে খলিফার প্রাসাদে গিয়ে বক্তব্য ও দোয়ার আয়োজন করতেন।

ফাতেমীয় শাসকেরা মহানবী (সা.)-এর পাশাপাশি ইমাম আলী (রা.), সাইয়্যিদা ফাতিমা (রা.) এবং তৎকালীন ফাতেমীয় ইমামের জন্মদিনও পালন করতেন। পরবর্তী সময়ে এসব আয়োজনের কিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সুন্নিদের মধ্যে মিলাদ উদযাপনের ইতিহাস

মিলাদুন্নবী ফাতেমীয়দের সময় চালু হয়েছিল—এমন ধারণা থাকলেও ইতিহাসবিদ ও ফকিহদের কেউ কেউ এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন।

প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি তার হাসানুল মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনীয় বড় পরিসরের মিলাদ আয়োজনের প্রচলন করেছিলেন আরবিলের শাসক বাদশা মুজাফফরুদ্দীন আবু সাঈদ কৌকরী।

সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সময়কার এই শাসক তার দানশীলতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত ছিলেন। তার আয়োজিত মিলাদে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিতেন। খাবার বিতরণ, আলেম ও সুফিদের সম্মাননা এবং ধর্মীয় আলোচনা ছিল আয়োজনের অন্যতম অংশ।

ইবনে কাসির, আজ-জাহাবি ও ইবনে খাল্লিকানের মতো ইতিহাসবিদরাও মুজাফফর সম্পর্কে তাদের গ্রন্থে বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করেছেন। তাদের বর্ণনায় মিলাদ উপলক্ষে বড় ধরনের খাবারের আয়োজন, দরিদ্রদের সহায়তা এবং আলেম-সুফিদের উপস্থিতির কথা পাওয়া যায়।

উসমানীয় আমলে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন

উসমানীয় সাম্রাজ্যের সময়ও মিলাদুন্নবী রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব পায়। সুলতানরা এ উপলক্ষে বড় মসজিদে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা, আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এতে অংশ নিতেন।

অনুষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াতের পর মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও জীবন নিয়ে আলোচনা করা হতো। দরুদ, জিকির ও নাত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হতো। অনেক ক্ষেত্রে সুলতান নিজেও জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা নিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।

সাধারণত রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখকে কেন্দ্র করে এসব আয়োজন করা হতো।

মিলাদুন্নবী নিয়ে আলেমদের মতভেদ

মিলাদুন্নবী উদযাপন নিয়ে ইসলামি ফিকহে সুস্পষ্ট মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম মনে করেন, মহানবী (সা.)-এর জন্মে আনন্দ প্রকাশ এবং তার জীবন ও আদর্শ স্মরণ করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের আয়োজন করা যেতে পারে। তারা এটিকে ভালো বা প্রশংসনীয় বিদআতের আওতায় দেখেছেন।

ইমাম সুয়ুতি, ইবনে হাজার আল-আসকালানি, সাখাওয়ি, ইবনে আবেদিন, ইবনে আল-জাজারি, ইমাম নববী ও কাস্তাল্লানিসহ কয়েকজন আলেমের বক্তব্যকে এ মতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়।

অন্যদিকে ইবনে তাইমিয়া, আশ-শাতিবি ও তাজুদ্দিন আল-ফাকিহানির মতো আলেম মিলাদুন্নবীর আনুষ্ঠানিক আয়োজনকে সমর্থন করেননি। তাদের মতে, মহানবী (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও ইসলামের প্রথম যুগের আলেমরা এভাবে মিলাদ পালন করেননি। তাই পরবর্তী সময়ে চালু হওয়া এ ধরনের আয়োজনকে তারা বিদআত হিসেবে দেখেছেন।

মতভেদ এখনো রয়েছে

বর্তমানেও মিলাদুন্নবী পালন নিয়ে মুসলিম সমাজে মতপার্থক্য রয়েছে। সুফি ও বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী এ উপলক্ষে ব্যাপক আয়োজন করে থাকে। অন্যদিকে সালাফি আলেমদের একটি অংশ এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতা থেকে বিরত থাকার পক্ষে মত দেন।

সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ ইবনে বাজের মতো আলেমদের মতে, শরিয়তে মিলাদুন্নবী উদযাপনের নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। তাদের যুক্তি, মহানবী (সা.) নিজে কিংবা সাহাবিরা এভাবে জন্মদিন পালন করেননি।

অর্থাৎ, ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের ইতিহাস একক কোনো ধারায় সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের বিভিন্ন সময় ও অঞ্চলে এর আয়োজনের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। একই সঙ্গে এর ধর্মীয় বৈধতা নিয়েও আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তাই মিলাদুন্নবীর ইতিহাস বুঝতে হলে ঐতিহাসিক বিবরণ ও ফিকহি মতপার্থক্য—দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।


সূত্র : আরবি পোস্ট
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন