স্তন ক্যানসার শনাক্তে এআই, টিউমারের সূক্ষ্ম পরিবর্তনে নতুন তথ্য

স্তন ক্যানসারের টিউমারের ভেতরের অতি সূক্ষ্ম অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নতুন সাফল্যের দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের গবেষকেরা। গবেষণায় টিউমার কোষের সেন্ট্রোসোম নামের ক্ষুদ্র কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে ক্যানসারের আক্রমণাত্মক বৈশিষ্ট্য ও রোগীর চিকিৎসাগত ফলাফলের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে। গবেষণাটি ১৮ আগস্ট Nature Communications জার্নালে প্রকাশিত হয়।
গবেষণার মূল বিষয় সেন্ট্রোসোম। কোষ বিভাজনের সময় জিনগত উপাদান সঠিকভাবে বণ্টন এবং কোষের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সংগঠনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেন্ট্রোসোমে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে কোষ বিভাজনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হতে পারে, যা ক্যানসারের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে টিউমারের বিপুলসংখ্যক কোষে এই অতি ক্ষুদ্র কাঠামোর পরিবর্তন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা দীর্ঘদিন ধরে বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ছিল। এই সমস্যার সমাধানে গবেষকেরা তৈরি করেছেন ‘সেনসেগনেট’ (Centrosome Segmentation Network) নামে একটি ওপেন-সোর্স এআই প্ল্যাটফর্ম।
গবেষকদের তৈরি এই প্রযুক্তি টিউমারের নমুনায় থাকা বিপুলসংখ্যক কোষ বিশ্লেষণ করে সেন্ট্রোসোমের সংখ্যা, আকার ও অবস্থানের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে পারে। ড. সালাহ এলিয়াসের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় ইউনিভার্সিটি হসপিটাল সাউদাম্পটনে চিকিৎসা নেওয়া ১২৭ জন স্তন ক্যানসার রোগীর নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। মোট ৯১১টি টিউমার নমুনায় ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি সেন্ট্রোসোম পরীক্ষা করা হয়েছে।
দুই ধরনের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত
এআই বিশ্লেষণে সেন্ট্রোসোমের দুটি পৃথক পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। কিছু ক্যানসার কোষে স্বাভাবিকের তুলনায় সেন্ট্রোসোমের সংখ্যা বেড়ে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে সেন্ট্রোসোমের আকার অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে ওঠে।
গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ হলো, এই দুই ধরনের পরিবর্তন একই প্রক্রিয়ার অংশ নাও হতে পারে। এগুলো স্বাধীনভাবে ঘটতে পারে এবং একই টিউমারের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বড় আকারের সেন্ট্রোসোম বেশি থাকা টিউমার তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রমণাত্মক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব টিউমারে উচ্চতর গ্রেড, লিম্ফ নোডে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া এবং নির্দিষ্ট কিছু জেনেটিক পরিবর্তনের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে।
অন্যদিকে, টিউমারের কেন্দ্রীয় অংশে বড় সেন্ট্রোসোমের সংখ্যা কম থাকা রোগীদের দীর্ঘমেয়াদে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
ভবিষ্যতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসায় সম্ভাবনা
গবেষকদের মতে, সেন্ট্রোসোমের অস্বাভাবিকতাকে একটি একক বৈশিষ্ট্য হিসেবে না দেখে এর ধরন, অবস্থান ও জৈবিক প্রভাব আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে ক্যানসারের আচরণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে এ ধরনের তথ্য নতুন বায়োমার্কার শনাক্ত এবং রোগীর ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
তবে সেনসেগনেট এখনো নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও বড় পরিসরে যাচাই করতে হবে। ভবিষ্যতে টিউমারের সেন্ট্রোসোমের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে উচ্চঝুঁকির রোগী শনাক্ত করা এবং নির্দিষ্ট জৈবিক দুর্বলতাকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সেন্ট্রোসোমের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কয়েকটি ওষুধও বর্তমানে উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে নতুন এই এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের ক্যানসার গবেষণা ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকেরা।
সেনসেগনেট ওপেন-সোর্স হওয়ায় বিশ্বের গবেষক ও প্যাথলজিস্টরা এটি ব্যবহার করতে পারবেন। স্তন ক্যানসারের পাশাপাশি কিডনি, কোলন ও অ্যাপেন্ডিক্সের টিস্যুতেও প্রযুক্তিটির প্রয়োগ পরীক্ষা করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে জিনোমিক, ট্রান্সক্রিপ্টোমিক ও প্রোটিওমিক তথ্যের সঙ্গে এআই বিশ্লেষণকে যুক্ত করে সেন্ট্রোসোমভিত্তিক বায়োমার্কার চিকিৎসা নির্বাচনে কতটা কার্যকর হতে পারে, তা যাচাই করতে চান গবেষকেরা।