মানসিক চাপ কি হৃদরোগ ডেকে আনে? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ব্যস্ত জীবন, কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা আর্থিক অনিশ্চয়তা—এসব কারণে মানসিক চাপ এখন অনেকের নিত্যসঙ্গী। সাময়িক চাপ স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে তা শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সুস্থতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সম্পর্ক নিয়ে চিকিৎসকরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মানসিক চাপ একাই হৃদরোগের কারণ না হলেও এটি হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে থাকলে শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্রকে দুর্বল করে দিতে পারে।
মানসিক চাপের সময় শরীরে কী ঘটে?
কোনো চাপপূর্ণ পরিস্থিতিতে শরীর থেকে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন নামের দুটি হরমোন নিঃসৃত হয়। এসব হরমোন শরীরকে তাৎক্ষণিক বিপদের জন্য প্রস্তুত করে। ফলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়।
স্বল্প সময়ের জন্য এই প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থা চলতে থাকলে উচ্চ রক্তচাপ, প্রদাহ, ঘুমের সমস্যা এবং রক্তে শর্করার ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। এসব পরিবর্তন হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
শুধু মানসিক চাপেই কি হৃদরোগ হয়?
চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগ সাধারণত একাধিক ঝুঁকির কারণ একসঙ্গে কাজ করার ফল। তবে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হৃদযন্ত্রের রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।
নিয়মিত মানসিক চাপে থাকলে দীর্ঘ সময় রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। এতে রক্তনালির ক্ষতি হয় এবং হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। পাশাপাশি রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়।
‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ কী?
‘কিউরিয়াস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তীব্র মানসিক আঘাতের পর কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ দেখা দিতে পারে। প্রিয়জনের মৃত্যু, বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা গভীর মানসিক আঘাতের মতো ঘটনার পর এই সমস্যা হতে পারে। এতে সাময়িকভাবে হৃদপেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসও বাড়ায় ঝুঁকি
অনেকেই মানসিক চাপ কমাতে ধূমপান, মদ্যপান, অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়া বা অলস জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আবার পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়াও বড় একটি সমস্যা।
এসব অভ্যাস স্থূলতা, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়, যা হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। অর্থাৎ, মানসিক চাপ সরাসরি যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনি অস্বাস্থ্যকর জীবনধারার মাধ্যমেও হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে যা করবেন
মানসিক চাপ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, যোগব্যায়াম বা সাইকেল চালানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। পাশাপাশি ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য গ্রহণ করা জরুরি।
প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রয়োজনে পরিবার, বন্ধু বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলাও মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপকে অবহেলা না করে সময়মতো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে শুধু মানসিক সুস্থতাই নয়, হৃদযন্ত্রকেও দীর্ঘদিন ভালো রাখা সম্ভব।