মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • সরকারি চাকরিতে নারীদের কোটা পুনর্বহালের দাবি মহিলা পরিষদের হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ৮২৮ জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে শপিং মল ধস, আহত অর্ধশত; প্রত্যাহার সুনামি সতর্কতা পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয়ে অর্থ দাবি, প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী বিএসইসিতে চার বছরের জন্য নতুন কমিশনার হোসেন সাদাত সৌরবিদ্যুতের প্রসারের আড়ালে বাড়ছে ই-বর্জ্যের ঝুঁকি, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা টুথপেস্টে মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক, তবু এখনই আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তুত ইসি: সিইসি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান
  • সৌরবিদ্যুতের প্রসারের আড়ালে বাড়ছে ই-বর্জ্যের ঝুঁকি, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

    সৌরবিদ্যুতের প্রসারের আড়ালে বাড়ছে ই-বর্জ্যের ঝুঁকি, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশেও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে এই ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি নীরবে তৈরি হচ্ছে আরেকটি বড় সংকট—সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও চার্জ কন্ট্রোলার থেকে উৎপন্ন ই-বর্জ্য। কার্যকর নীতিমালা ও পুনর্ব্যবস্থাপনার অভাবে এই বর্জ্য ভবিষ্যতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

    জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্রিস্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (সিসিডিবি)-এর ক্লাইমেট সেন্টারের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্যানেলগুলো মেয়াদ শেষ হলে প্রায় ৩৩ হাজার ২০৫ টন ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে। যথাযথ পুনর্ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এসব বর্জ্য থেকে প্রায় ২৪ হাজার ৪৬৮ টন কাচ, ২ হাজার ৬৫৬ টন অ্যালুমিনিয়াম, ১ হাজার ৪০৪ টন সিলিকন এবং প্রায় ৫০ টন তামা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

    গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এই বিপুল সৌর বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদভাবে নিষ্পত্তির জন্য এখনো কার্যকর জাতীয় নীতিমালা ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। ফলে মূল্যবান উপাদান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বর্জ্যে থাকা সিসা, ক্যাডমিয়ামসহ ভারী ধাতু পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

    সাধারণত একটি সৌর প্যানেলের আয়ুষ্কাল ১৫ থেকে ২৫ বছর। সেই সময় শেষে প্যানেলগুলো ই-বর্জ্যে পরিণত হয়। ফলে বর্তমানে স্থাপিত লাখ লাখ সৌর প্যানেল আগামী বছরগুলোতে একযোগে বাতিল হতে শুরু করলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ সৃষ্টি হবে।

    ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে শুধু সোলার প্যানেল থেকেই বাংলাদেশে প্রায় ৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে। সংস্থাটি আরও বলেছে, ২০২১ সালের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা থাকলেও এর বাস্তবায়ন খুবই সীমিত। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য ও ই-বর্জ্য আমদানি অব্যাহত রয়েছে।

    টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যমান বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধনের পাশাপাশি বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশিকা ও কর্মপরিকল্পনা জরুরি।

    সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ই-বর্জ্য পরিবেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় Reduce, Reuse, Recycle (থ্রি-আর) নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার নতুন পরিবেশগত সংকট তৈরি না করে।

    এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে রিসোর্স রিকভারি সেন্টার (এমআরএফ) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে প্লাস্টিক, জৈব বর্জ্যের পাশাপাশি ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

    ১৯৯৭ সাল থেকে সৌরবিদ্যুৎ খাতে কাজ করা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) জানিয়েছে, দেশে প্রায় ৬০ লাখ ছোট-বড় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে মান নিয়ন্ত্রণের অভাবে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ফলে অনেক প্যানেল ও ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, যা ই-বর্জ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

    ইডকলের ডেপুটি সিইও এস এম মনিরুল ইসলাম বলেন, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ খাত আরও টেকসই হবে এবং ই-বর্জ্যের ঝুঁকিও কমবে।

    জাতিসংঘভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ ৮ কোটি টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ এর মাত্র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে।

    বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৭ থেকে ২৮ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ই-বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৪৬ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ ই-বর্জ্য অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত হয়। পুরোনো যন্ত্রাংশ খোলা জায়গায় পুড়িয়ে, এসিড ব্যবহার করে বা ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে ধাতু আলাদা করা হয়। এতে শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশও মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

    সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই খাতে বিপুলসংখ্যক শিশু কাজ করছে। পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৫০ হাজার শিশু অনানুষ্ঠানিকভাবে ই-বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের কাজে যুক্ত। বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকায় তারা শ্বাসতন্ত্র, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র ও ত্বকের নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে সার্কুলার ইকোনমি ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। উৎপাদন থেকে ব্যবহার এবং মেয়াদ শেষে পুনর্ব্যবহার—পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে পুরোনো সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি ফেরত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং কার্যকর রিসাইক্লিং অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন