বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
Natun Kagoj

সংবাদপত্রের কালো দিবস: ইতিহাস, বাস্তবতা ও গণমাধ্যমের বর্তমান সংকট

সংবাদপত্রের কালো দিবস: ইতিহাস, বাস্তবতা ও গণমাধ্যমের বর্তমান সংকট
ছবি: এআই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আজ ১৬ জুন, বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের কাছে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ হিসেবে পরিচিত একটি দিন। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে দেশের সংবাদপত্র শিল্পে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় চারটি পত্রিকা রেখে বাকিগুলোর ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে অসংখ্য সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যায় এবং হাজারো সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী কর্মহীন হয়ে পড়েন। বাংলাদেশের গণমাধ্যম ইতিহাসে এটি এক গভীর সংকটকাল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মতে, ওই সময়ের রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মতপ্রকাশের পরিসর সীমিত হয়ে পড়ে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ১৯৭৬ সাল থেকে ১৬ জুনকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে সাংবাদিক সমাজ।

এ উপলক্ষে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত আলোচনা সভায় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা অংশ নিয়েছেন।

ঐতিহাসিকভাবে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি শুধু একটি সময়কাল বা একটি সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি টানাপোড়েনের প্রতিফলন। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর বক্তব্যে উঠে আসে যে, স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণমাধ্যম একদিকে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, অন্যদিকে মালিকানাগত চাপ—এই দুই ধরনের প্রভাবের মধ্যে থেকেছে।

বর্তমান সময়ে এসে গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জের ধরন আরও জটিল হয়েছে। সরাসরি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দুর্বলতা, বিজ্ঞাপন নির্ভরতা, কর্পোরেট মালিকানার চাপ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতা সাংবাদিকতার মান ও স্বাধীনতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের দ্রুত বিস্তার এবং ভুয়া বা বিকৃত তথ্যের প্রসার বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নয়, গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ কাঠামোও এই সংকটের জন্য দায়ী। সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো, চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও মালিকানাগত হস্তক্ষেপের দ্বন্দ্বও অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ফলে ‘কালো দিবস’ শুধু অতীতের একটি ঘটনার স্মরণ নয়, বরং এটি গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থার একটি আত্মপর্যালোচনার সুযোগও তৈরি করে। ইতিহাসের শিক্ষা অনুযায়ী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা টেকসই করতে হলে কেবল আইনগত কাঠামো নয়, পেশাগত নৈতিকতা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন—এমনটাই মত সংশ্লিষ্টদের।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন