জাতীয় দলে সুরভী, ফুটবলে ছড়াতে চান নতুন সৌরভ

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সোনারপাড়া গ্রাম। সেখানেই জন্ম সুরভী আক্তার আফরিনের। বাবা সেকেন্দার আলী প্রধান পেশায় মেডিসিন সেলার, মা জোৎস্না বেগম গৃহিণী। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সুরভী পরিবারের তৃতীয় সন্তান। তবে ফুটবলের মাঠে তিনি এখন পরিবারের সবচেয়ে আলোচিত নাম।
মাত্র ৫ জুন ২০০৮ সালে জন্ম নেওয়া সুরভী আক্তার আফরিন এবার প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ক্যাম্পে। আর এই স্বপ্নযাত্রার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন তার বড় বোন স্মৃতি আফরিন শোভা।
বড় বোনের স্বপ্ন থেকে ফুটবলে যাত্রা
সুরভীর বড় বোন স্মৃতি নিজেও ফুটবলার ছিলেন এবং ছোট বোনকে বড় খেলোয়াড় বানানোর স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্নের হাত ধরেই স্থানীয় কোচ মো. রায়হানের কাছে ফুটবলে হাতেখড়ি হয় সুরভীর, যখন তিনি ক্লাস টু-তে পড়তেন।

পরবর্তীতে রেজাউল করিম ও মো. রানার কাছ থেকেও প্রশিক্ষণ নেন তিনি। এরপর বিকেএসপিতে ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেও পরিবারের সিদ্ধান্তে সেখানে ভর্তি হতে পারেননি সুরভী।
ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া
গ্রাম, থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে খেলতে খেলতে সুরভীর নাম ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর নারী ফুটবল লিগে কুমিল্লা ইউনাইটেড ক্লাবের হয়ে ২০২১–২২ মৌসুমে খেলার মাধ্যমে শুরু হয় তার পেশাদার যাত্রা।

২০২৩ সালে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ আর্মি স্পোর্টস ক্লাবে। সেখানে সাবেক জাতীয় কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন এবং পরবর্তীতে কোচ আনোয়ার হোসেনের অধীনে নিজের দক্ষতা আরও শানিত করেন।
জাতীয় দলে স্বপ্নের ডাক
আর্মি ক্লাবে খেলার পরই সুরভী ডাক পান বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে রানার্সআপ দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
এর আগে ২০১৯ সালে অনূর্ধ্ব-১২ ক্যাম্পেও ছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে অবশেষে জায়গা করে নেন সিনিয়র জাতীয় দলের ক্যাম্পে।

সুরভী বলেন, কখনো ভাবিনি এত দ্রুত জাতীয় দলে ডাক পাব। এখন বাফুফের ক্যাম্পে আছি, অনেক ভালো লাগছে।
বড় বোনের সঙ্গে মাঠে খেলার স্বপ্ন
যে বড় বোনের হাত ধরে ফুটবলে আসা, তার সঙ্গে একই মাঠে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার স্বপ্ন এখনও দেখেন সুরভী।
তিনি বলেন, “একটা ম্যাচে আপুর সঙ্গে খেলেছি, কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে একসঙ্গে খেলার আনন্দই আলাদা। আশা করি সেই স্বপ্ন পূরণ হবে।”
ডিফেন্ডার হিসেবে পরিচিতি
সুরভী মূলত স্টপার বা লেফট ব্যাক পজিশনে খেলেন। জাতীয় দলের ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীন, শামসুন্নাহার সিনিয়র ও আঁখি খাতুনকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন তিনি।
বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া
পরিবার থেকে সমর্থন পেলেও সমাজের নানা কটূক্তি শুনতে হয়েছে তাকে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সমালোচনাই বদলে গেছে প্রশংসায়।
সুরভী বলেন, আগে অনেকেই বলত মেয়ে হয়ে ফুটবল খেলার দরকার নেই। এখন তারাই আমাদের দেখতে আসে, খুশি হয়।
থাইল্যান্ডে প্রস্তুতি ক্যাম্পে সুরভী
আসন্ন সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ সামনে রেখে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল বর্তমানে থাইল্যান্ডে প্রস্তুতি ক্যাম্প করছে। সেই দলে রয়েছেন সুরভী আক্তার আফরিনও।
পরিবারের স্বপ্ন, বড় বোনের অনুপ্রেরণা আর নিজের পরিশ্রম—সব মিলিয়ে সুরভীর ফুটবল যাত্রা এখন জাতীয় পর্যায়ে। এখন দেখার বিষয়, এই তরুণ ডিফেন্ডার আন্তর্জাতিক মঞ্চে কতটা আলো ছড়াতে পারেন।