কেরু অ্যান্ড কোম্পানি; জমির মূল্যায়নে চমকপ্রদ ব্যবধান, আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

দেশের অন্যতম রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের সম্পদ ও হিসাব ব্যবস্থাপনা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য ঘিরে প্রতিষ্ঠানটির জমি, মজুত এবং আর্থিক হিসাব ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অসঙ্গতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ১২৯ কোটি টাকা মুনাফা দেখালেও প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী সম্পদের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ জমির মূল্যায়ন অত্যন্ত কম দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেখানে প্রায় ১০ হাজার ৬৬৮ বিঘা জমির মোট মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র কয়েক লাখ টাকার কাছাকাছি, ফলে প্রতি বিঘার হিসাব দাঁড়াচ্ছে মাত্র কয়েক দশক টাকার মতো। বর্তমান বাজার বাস্তবতার সঙ্গে এই মূল্যায়নের পার্থক্যকে অনেকেই অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন।
নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে জমির পুনর্মূল্যায়ন না হওয়ায় এই বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন করার কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
শুধু জমি নয়, অন্যান্য সম্পদের হিসাবেও ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। আখসহ বিভিন্ন উৎপাদনশীল সম্পদকে যথাযথভাবে জৈবিক সম্পদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করায় মোট সম্পদের প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া মজুত পণ্য ও স্টোর সামগ্রী হিসাবেও অস্পষ্টতা পাওয়া গেছে। বিপুল অঙ্কের মজুত থাকা সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গ ইনভেন্টরি তালিকা অনুপস্থিত ছিল বলে নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন। উৎপাদনাধীন পণ্যের মূল্য নির্ধারণেও প্রচলিত নিয়ম পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যান্য দিকেও বেশ কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে সঠিক বিনিময় হার প্রয়োগ না করা, বিলম্বিত কর হিসাব না রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক রিটার্ন দাখিল না করার মতো বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।
শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলের অর্থের ওপর সুদ প্রদান না করার বিষয়টি শ্রম আইন পরিপালনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব সমস্যার মূল কারণ পুরনো হিসাব পদ্ধতি এবং দীর্ঘদিন ধরে সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন না করা। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্পদের নতুন মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হালনাগাদ বাজারমূল্য অনুযায়ী হিসাব হালনাগাদ করা হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মুনাফা দেখানো সত্ত্বেও সম্পদ ও দায়ের এই ধরনের অসামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাদের মতে, নিরপেক্ষ ও আধুনিক অডিট ব্যবস্থা ছাড়া প্রকৃত আর্থিক চিত্র পরিষ্কার হওয়া কঠিন।
এই প্রতিবেদনটি একটি ধারাবাহিক অনুসন্ধানের প্রথম পর্ব হিসেবে প্রকাশিত হলো। পরবর্তী পর্বে প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয় কাঠামো, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং দায়-দেনার আরও গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হবে।