বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj

এন্ড্রোমেডার আলোতে ‘ব্লু শিফট’; মহাকাশবিজ্ঞানের নতুন সমীকরণ

এন্ড্রোমেডার আলোতে ‘ব্লু শিফট’; মহাকাশবিজ্ঞানের নতুন সমীকরণ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

মহাবিশ্বের এক পরম সত্য হলো এর প্রসারণ। বিগ ব্যাং-এর পর থেকে স্পেস বা মহাশূন্য ক্রমাগত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, যার ফলে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে কোটি কোটি মাইল দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু এই মহাজাগতিক নিয়মের মাঝেও একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা বিজ্ঞানীদের কৌতূহলী করে তুলেছে— তা হলো আমাদের প্রতিবেশী গ্যালাক্সি ‘এন্ড্রোমেডা’র ধেয়ে আসা। মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়া সত্ত্বেও কেন এন্ড্রোমেডা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে, তার নেপথ্যে রয়েছে মহাকর্ষ বল ও প্রসারণের এক অদৃশ্য লড়াই।

লড়াইটি মহাকর্ষ বনাম প্রসারণের

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মহাশূন্যের প্রসারণ এন্ড্রোমেডাকে আমাদের থেকে যতটা দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, মহাকর্ষ বল (Gravitational Pull) তার চেয়েও বেশি গতিতে তাকে আমাদের কাছে টেনে আনছে। মহাকাশবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় 'রিসেশান ভেলোসিটি' বনাম 'গ্র্যাভিটেশনাল অ্যাকসেলারেশন'।

গাণিতিক সমীকরণে এন্ড্রোমেডার গতি

মহাজাগতিক প্রসারণের হার অনুযায়ী, প্রতি এক মেগাপারসেক (প্রায় ৩২.৬ লক্ষ আলোকবর্ষ) দূরত্বে প্রসারণের গতি সেকেন্ডে ৭০ কিলোমিটার। এন্ড্রোমেডা বর্তমানে আমাদের পৃথিবী থেকে ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই দূরত্ব অনুযায়ী, মহাশূন্যের প্রসারণ এন্ড্রোমেডাকে প্রতি সেকেন্ডে ৫৫ কিলোমিটার গতিতে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, আমাদের মিল্কিওয়ে এবং এন্ড্রোমেডা গ্যালাক্সির বিশাল ভরের কারণে সৃষ্ট মহাকর্ষ বল একে অপরকে প্রতি সেকেন্ডে ১৬৫ কিলোমিটার গতিতে কাছে টেনে আনছে।

  • নিট ফলাফল: ১৬৫ (কাছে আসা) - ৫৫ (দূরে সরা) = ১১০ কিমি/সেকেন্ড। অর্থাৎ, সব বাধা পেরিয়ে এন্ড্রোমেডা প্রতি সেকেন্ডে ১১০ কিলোমিটার গতিতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

প্রমাণ দিচ্ছে ‘ব্লু শিফট’

এন্ড্রোমেডা যে সত্যিই কাছে আসছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় টেলিস্কোপে ধরা পড়া তার আলোর বর্ণালীতে। যখন কোনো মহাজাগতিক বস্তু কাছে আসে, তখন তার আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়ে নীল রঙের দিকে সরে যায়, যাকে বলা হয় ‘ব্লু শিফট’ (Blue Shift)। এন্ড্রোমেডার আলোতে এই ব্লু শিফট দেখেই বিজ্ঞানীরা এর ধেয়ে আসার গতি নিশ্চিত করেছেন।

অন্যান্য গ্যালাক্সি কেন দূরে সরে যায়?

প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে অন্য গ্যালাক্সিগুলো কেন দূরে সরে যাচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে দূরত্বের মাঝে। মহাকর্ষ বল দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক হারে কমে। অর্থাৎ দূরত্ব দ্বিগুণ হলে গ্র্যাভিটি চারগুণ কমে যায়। ৫ বা ১০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে গেলে দেখা যায়, প্রসারণের গতি মহাকর্ষ বলকে অনায়াসেই হারিয়ে দিচ্ছে। ফলে ‘লোকাল’ বা কাছাকাছি দূরত্বে মহাকর্ষ বল জয়ী হলেও, বিশাল দূরত্বের ক্ষেত্রে মহাবিশ্বের প্রসারণই শেষ কথা বলে।

বিজ্ঞানীদের মতে, কয়েক বিলিয়ন বছর পর এই মহাকর্ষীয় টানের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মিল্কিওয়ে এবং এন্ড্রোমেডা গ্যালাক্সি একে অপরের সাথে মিশে গিয়ে একটি বিশাল উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি তৈরি করবে।


দৈএনকে/জে, আ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন