ক্ষুদ্র প্রাণীর গর্জনে সমুদ্রতলে বিস্ময়

প্রকৃতির রহস্যের কোনো শেষ নেই। অনেক সময় বিশাল কোনো প্রাণী যা করতে পারে না, ক্ষুদ্র এক সৃষ্টি তা অনায়াসেই করে দেখায়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই এক অবিশ্বাস্য তথ্য। মাত্র ১.২ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের একটি ক্ষুদ্র মাছ, যার নাম 'Danionella cerebrum', এমন এক উচ্চমাত্রার শব্দ তৈরি করতে সক্ষম যা কোনো জেট বিমান ওড়ার শব্দের চেয়েও তীব্র হতে পারে।
শব্দের তীব্রতা যখন ১৪০ ডেসিবেল
সাধারণত আমরা মনে করি গভীর সমুদ্রের তিমির ডাকই বোধহয় সবচেয়ে জোরালো। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, নখ বা ছোট বুড়ো আঙুলের সমান এই মাছটি প্রায় ১৪০ ডেসিবেলের কাছাকাছি শব্দ উৎপন্ন করতে পারে। মানুষের শ্রবণশক্তির জন্য এটি অত্যন্ত তীব্র এবং ব্যথাদায়ক পর্যায়ের একটি আওয়াজ। তুলনা করলে দেখা যায়, একটি সাধারণ শটগানের গুলির শব্দ বা টেক-অফ করা জেট ইঞ্জিনের শব্দের কাছাকাছি এটি।
মাছটির ভেতর যেন এক ক্ষুদ্র ড্রাম সেট
জার্মানির সেনকেনবার্গ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই মাছটির শব্দ তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ও বিস্ময়কর। এটি তার শরীরের বিশেষ কিছু শক্তিশালী পেশি, পাঁজরের হাড় এবং একটি ড্রামসদৃশ কাঠামোর সাহায্যে অত্যন্ত দ্রুত কম্পন তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা ক্ষুদ্র কোনো বাদ্যযন্ত্র বা ড্রাম বাজানোর মতো কাজ করে। ধারণা করা হচ্ছে, গভীর কর্দমাক্ত পানিতে প্রজননের সময় সঙ্গীকে আকর্ষণ করতে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভয় দেখিয়ে এলাকা রক্ষা করতে তারা এই উচ্চ শব্দ ব্যবহার করে।
স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত
শুধুমাত্র গর্জনের জন্যই নয়, এই মাছটি বিজ্ঞানীদের কাছে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তার স্বচ্ছ শরীর এবং ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের জন্য। এত ছোট মস্তিষ্ক থাকা সত্ত্বেও মাছটি যে ধরনের জটিল আচরণ এবং যোগাযোগ পদ্ধতি প্রদর্শন করে, তা স্নায়ুবিজ্ঞানের (Neuroscience) গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের ব্রেইন ফাংশন এবং আচরণগত রহস্য উন্মোচনে এই প্রজাতিটি ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ 'মডেল' হিসেবে কাজ করতে পারে।
আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও শক্তির বিচারে এই মাছটি প্রমাণ করে দিল যে, সাগরের তলদেশে গর্জনের জন্য বিশালাকার দেহের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু সঠিক কৌশলের।