লক্ষ্মীপুরে ৫৬ কোটি টাকার ওয়াশ ব্লক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

লক্ষ্মীপুর জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৫৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ, অসম্পূর্ণ নির্মাণ এবং কাগজে অগ্রগতি দেখানোর মতো গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে তদন্তে।
জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) এর আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৩১৪টি ওয়াশ ব্লক নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৩৮টি, রামগঞ্জে ৯৮টি, রায়পুরে ৩৬টি, রামগতিতে ৩০টি এবং কমলনগরে ১২টি ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রতিটি ওয়াশ ব্লকের জন্য গড়ে ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে কাজ এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও শুধু ভবনের কাঠামো নির্মাণ করে ফেলে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ না হলেও কাগজে ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রায়পুর উপজেলার মহাদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, তাদের বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লকের হাইকমোড, ফিটিংস ও বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ এখনো বাকি থাকলেও প্রকৌশলী অফিস ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ এসেছে চরবংশী, কাঞ্চনপুর ও চরইনদুরিয়া এলাকার বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকেও। দক্ষিণ চরইনদুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোকসানা বেগম বলেন, “৬-৭ মাস আগে ভবনের কাঠামো নির্মাণের পর কাজ বন্ধ রয়েছে। পানির ট্যাংকের গর্তে বৃষ্টির পানি জমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য হুমকিস্বরূপ।”
অন্যদিকে, রায়পুরের ৭৬নং চরবামনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হাছিনা আক্তার অভিযোগ করেন, “১০ মিলিমিটার রডের পরিবর্তে ৮ মিলিমিটার রড ব্যবহার করা হয়েছে, যা অত্যন্ত নিম্নমানের কাজের প্রমাণ।” কাঞ্চনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুকুল হোসেনও একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন। সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন জানান, অনেক বিদ্যালয়ে কাজের মান খারাপ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়নি। পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
রায়পুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মঈনুল ইসলাম বলেন, “৩৬টি স্কুলে কাজ চললেও ঠিকাদার ও প্রকৌশল দপ্তর থেকে কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ আসছে।”
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করে দ্রুত কাজ শেষ করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে তারা এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধও জানান। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, অধিকাংশ কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী বিলকিস আক্তার বলেন, ঠিকাদারদের সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করতে উপজেলা পর্যায়ের প্রকৌশলীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজ্জাদ জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে নিম্নমানের নির্মাণের কারণে ভবিষ্যতে এসব ওয়াশ ব্লক ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।