জনপ্রশাসনে অস্থিরতায় বছর পার, সংস্কার না বিশৃঙ্খলা?

২০২৫ সাল বাংলাদেশের জনপ্রশাসনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বিতর্ক, আন্দোলন ও অস্থিরতার এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে। সরকারি চাকরি অধ্যাদেশ সংশোধন ঘিরে কর্মচারী আন্দোলন থেকে শুরু করে সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টাকে ‘নজিরবিহীন’ অবরোধ, শীর্ষ প্রশাসনিক পদ শূন্য থাকা, চুক্তিভিত্তিক বিতর্কিত সচিবদের বারবার বদলি এবং জেলা প্রশাসক নিয়োগে বিতর্ক—সব মিলিয়ে বছরজুড়ে জনপ্রশাসন ছিল টালমাটাল।
সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ ছিল এ অস্থিরতার সূচনাবিন্দু। চার ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা ছাড়াই চাকরিচ্যুত করার বিধান প্রশাসনের ভেতরেই গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি করে। কর্মচারীদের কাছে এটি ছিল একটি নিবর্তনমূলক ও কালো আইন। আন্দোলনের চাপে সরকার অধ্যাদেশ সংশোধনে বাধ্য হলেও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রশাসনিক সংলাপ ও আস্থার ঘাটতিই স্পষ্ট করেছে।
একই সময়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের দুই শতাধিক সুপারিশ সামনে এলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের ধীরগতি ও অনিশ্চয়তা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিভাগ ও প্রদেশভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো, মন্ত্রণালয় কমানো কিংবা গুচ্ছভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মতো বড় সংস্কার প্রস্তাবগুলো এখনো কাগজেই রয়ে গেছে। সংস্কারের ঘোষণা থাকলেও তার বাস্তব রূপরেখা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব প্রকট।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল মাসের পর মাস সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো কেন্দ্রীয় দপ্তরে সচিব না থাকা প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থবিরতা তৈরি হয়, যা সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব ফেলে। প্রশাসন যেখানে শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতার প্রতীক, সেখানে এমন শূন্যতা গভীর সংকেত দেয়।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন বিতর্কিত সচিবকে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে বারবার বদলি করার ঘটনাও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সাধারণত দক্ষতা ও বিশেষ প্রয়োজনের ভিত্তিতে হলেও, বাস্তবে তা হয়ে উঠেছে বিতর্ক এড়ানোর বদলে বিতর্কের উৎস। বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, ভুল সিদ্ধান্তের দায় এড়াতে পুনর্বাসনের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
ডিসি নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক প্রশাসনিক অস্থিরতাকে আরও ঘনীভূত করেছে। নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল স্বচ্ছতার বদলে সন্দেহ ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ ডেকে আনে। নিয়োগ বাতিল ও পুনর্নিয়োগ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে অনাস্থা বাড়িয়েছে।
এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টাকে ছয় ঘণ্টার বেশি সময় অবরুদ্ধ রাখার ঘটনায়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একজন উপদেষ্টাকে কর্মচারীদের হাতে কার্যত জিম্মি হওয়ার এই ঘটনা প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি শুধু শৃঙ্খলার ব্যর্থতাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও সংলাপ কাঠামোর গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল দেখিয়েছে—সংস্কারের নামে যদি অংশীজনদের আস্থা, স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা উপেক্ষিত হয়, তবে তা সংস্কারের বদলে বিশৃঙ্খলাই ডেকে আনে। জনপ্রশাসনকে কার্যকর ও জনগণমুখী করতে হলে প্রয়োজন সুসংহত নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সর্বোপরি প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন। অন্যথায় ‘নজিরবিহীন’ ঘটনা হয়তো আর ব্যতিক্রম থাকবে না, হয়ে উঠবে নিয়ম।