নৌপথের নাব্যতা রক্ষায় ৪ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প, অগ্রগতি ৫৩ শতাংশ

দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের নাব্যতা উন্নয়ন ও সংরক্ষণে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং সক্ষমতা বাড়াতে ৩৫টি ড্রেজারসহ মোট ১৬১টি জলযান ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামো নির্মাণের কাজও চলছে।
‘৩৫টি ড্রেজার ও সহায়ক জলযানসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ (১ম সংশোধিত) (বিশেষ সংশোধন)’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগ। প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৬৮৭ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। পুরো অর্থই জোগান দিচ্ছে সরকার।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথের নাব্যতা উন্নয়ন ও সংরক্ষণ, অভ্যন্তরীণ নৌরুট ও ফেরি রুট সচল রাখা এবং ফেরি, লঞ্চ ও পণ্যবাহী জাহাজের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা। এ ছাড়া দেশের প্রায় ১০০টি নদী খননের মাধ্যমে নৌপথের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্য রয়েছে।
২০১৮ সালের ১ অক্টোবর শুরু হওয়া প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। মূল প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি ৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫১৫ কোটি ৫২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। পরবর্তী বিশেষ সংশোধনে ব্যয় আরও বেড়ে ৪ হাজার ৬৮৭ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৩৫টি ড্রেজারের পাশাপাশি ১২৬টি সহায়ক জলযান সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ১৬১টি জলযান যুক্ত হলে বিআইডব্লিউটিএর নিজস্ব ড্রেজিং বহরের সক্ষমতা বাড়বে। প্রকল্পটির মাধ্যমে সংস্থাটির ড্রেজিং সক্ষমতা ৩২৬ দশমিক ৬৭ লাখ ঘনমিটার বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান মো. মুহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে নৌপথের গুরুত্ব অপরিসীম। নৌপথ সচল রাখতে নদীর নাব্যতা রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যেই সরকার বিআইডব্লিউটি-এর ড্রেজিং সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, নতুন ড্রেজার ও সহায়ক জলযান যুক্ত হলে দেশের বিভিন্ন নদী ও নৌরুটে খনন কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। এর ফলে নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ড্রেজার সংগ্রহের কাজ ইতিমধ্যে কয়েকটি পর্যায়ে এগিয়েছে। ২৪ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজারের আটটির মধ্যে দুটি সংগ্রহ করা হয়েছে। আরও চারটির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে; বাকি দুটির দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া অপেক্ষমাণ। ২০ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজারের চারটিরই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ১৮ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজারের ছয়টির মধ্যে চারটির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, বাকি দুটির প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি।
এ ছাড়া ১২ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজার দুটি, ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার একটি, পন্টুন মাউন্টেড গ্র্যাব ড্রেজার একটি এবং ১০ ইঞ্চি অ্যাম্ফিবিয়ান টাইপ কাটার সাকশন ড্রেজার নয়টি সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ড্রেজারের কয়েকটির ক্রয়প্রক্রিয়া বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। হপার ও গ্র্যাব ড্রেজার সংগ্রহের কাজও চলমান।
ড্রেজার পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য ২৩টি ক্রেনবোট এবং ১৭টি টাগবোট সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১০টি স্পিডবোট, একটি কু-হাউজবোট, ১৫টি পাইল ক্যারিং ডাম্ব বার্জ, একটি হাই স্পিড কেবিন ক্রুজার, একটি কেবিন ক্রুজার, একটি ওয়েল ক্লিনিং ভেসেল, চারটি রিভার ক্লিনিং ওয়ার্কবোট, নয়টি অ্যাম্ফিবিয়ান টাইপ কাটার সাকশন ড্রেজারের হাউজবোট, ১২টি ডং বুম অ্যাডাপ্টারের পন্টুন, ১১টি টার্মিনাল পন্টুন ও একটি সহায়ক পন্টুন সংগ্রহের উদ্যোগ রয়েছে।
ড্রেজিং কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণেও অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কক্সবাজার, সিলেট/সুনামগঞ্জ এবং পাইকগাছা/জামালপুরে ড্রেজার বেইজ অফিস নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ড্রেজার বেইজের ডরমিটরি নির্মাণে ৭ কোটি, কক্সবাজারে অফিসার্স কোয়ার্টার নির্মাণে ১৫ কোটি এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
এ ছাড়া আরিচা ড্রেজার বেইজে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে স্লিপওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই বেইজে প্রায় ৮ হাজার বর্গফুটের ডরমিটরি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডরমিটরিটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। শিমুলিয়া ড্রেজার বেইজে সাময়িকভাবে ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
প্রকল্পের বিভিন্ন নির্মাণ ও সংগ্রহ কার্যক্রম তদারকিতে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ড্রেজার ও জলযান তৈরি এবং সেগুলোর কাজ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি পরামর্শক প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ৯ কোটি ৭৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। একই ধরনের আরও একটি প্যাকেজে বরাদ্দ রয়েছে ৩ কোটি টাকা। ড্রেজার বেইজের অফিস, স্টোর, ডরমিটরি, অফিসার্স কোয়ার্টার ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রের নকশা তৈরি এবং নির্মাণকাজ তদারকির জন্য ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৩ হাজার টাকার পরামর্শক সেবা প্যাকেজ রয়েছে। বৈদেশিক প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা।
ড্রেজিং কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য প্রকল্পের আওতায় আরও ৩০টি সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৭টি এক্সকাভেটর, ১২টি ডাম্প ট্রাক ও একটি ট্রেনিং সিমুলেটর। এসব সরঞ্জাম মাটি অপসারণ ও পরিবহনের পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতে সহায়তা করবে।
প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় মোট ৬১টি প্যাকেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৫১টি পণ্য, ছয়টি কার্য এবং চারটি সেবা প্যাকেজ। অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব প্যাকেজের কয়েকটির ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) প্রদান ও চুক্তি সম্পাদনের কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংশোধিত ক্রয় পরিকল্পনায় নতুন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি কু-হাউজবোট সংগ্রহে প্রাক্কলিত ব্যয় ২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে অনুমোদনের জন্য প্যাকেজটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া একটি ২০ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজার ও সহায়ক সরঞ্জাম সংগ্রহে ১৪৯ কোটি ২২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ প্যাকেজের দরপত্র বিক্রির কার্যক্রম চলছে। একই ধরনের তিনটি ড্রেজার সংগ্রহে ২৪৭ কোটি ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি ১৮ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজার সংগ্রহে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। একই ধরনের আরও একটি ড্রেজার এবং দুটি ড্রেজার সংগ্রহের জন্যও পৃথক প্যাকেজ রয়েছে। সংশোধিত ক্রয় পরিকল্পনায় এসব প্যাকেজের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৮৯১ কোটি ২ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতির তথ্য অনুযায়ী, সম্পন্ন পণ্য কার্যক্রমের আর্থিক মূল্য ৯৫৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। চলমান কার্যক্রমের আর্থিক মূল্য ১ হাজার ২৫৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। প্রকল্প শুরুর পর থেকে ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৬৭ কোটি ৪ লাখ ৩ হাজার টাকা, যা মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৩৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৫৩ দশমিক ৪২ শতাংশ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ২২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব খাতে ১২ কোটি এবং মূলধন খাতে ২০৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে ৫৫৫ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছাড় করা হয়েছিল। ওই সময়ে ব্যয় হয়েছে ৩৫০ কোটি ১৮ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের উন্নয়ন ও নাব্যতা সংরক্ষণ সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কাজের একটি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিআইডব্লিউটি-এর আধুনিক ড্রেজিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রকল্পের প্রতিটি কাজের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। গুণগত মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বিভিন্ন নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় অনেক স্থানে নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বেড়ে যায়। আবার নাব্যতা সংকটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হলে সড়ক যোগাযোগেও এর প্রভাব পড়ে। এ অবস্থায় আধুনিক ড্রেজার ও সহায়ক জলযানের সংখ্যা বাড়লে নদী খনন কার্যক্রম আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট, ফেরিঘাট, বন্দর ও নদীবন্দরের নাব্যতা রক্ষা, নদীর গভীরতা বজায় রাখা এবং মৌসুমি নাব্যতা সংকট মোকাবিলায় বাড়তি সক্ষমতা কাজে আসবে। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সহজ হওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের নাব্যতা রক্ষা, নৌযোগাযোগ সচল রাখা এবং পণ্য পরিবহনে ব্যয় ও সময় কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।’
তিনি বলেন, প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথের নাব্যতা উন্নয়ন ও সংরক্ষণের লক্ষ্য সামনে রেখে বিআইডব্লিউটি-এর ড্রেজিং সক্ষমতা বাড়ানোর এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আধুনিক ড্রেজার, সহায়ক জলযান ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যুক্ত হলে নদী খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
সচিব আরও বলেন, প্রকল্পের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অর্থের যথাযথ ব্যবহার, কাজের গুণগত মান এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংগৃহীত ড্রেজার ও সরঞ্জামের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় জনবল প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও জোরদার করা হবে।
সূত্র: বাসস