শ্রমিকের মজুরির প্রশ্নে বিজিবি নামিয়ে সরকার কার পক্ষে, প্রশ্ন নাহিদের

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনে দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, শ্রমিকের মজুরির প্রশ্নে যে রাষ্ট্র রাজপথে বিজিবি নামায়, সেই রাষ্ট্র আসলে কার পক্ষে দাঁড়ায়, তা স্পষ্ট। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ন্যায্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (১ নভেম্বর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
পোস্টে তিনি লেখেন, গাজীপুর, মিরপুর, আশুলিয়া ও সাভারসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলছে। ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবিতে হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক রাজপথে নেমেছেন। দীর্ঘ সময় কাজ করেও মাস শেষে জীবনযাপনের ন্যূনতম ব্যয় মেটাতে না পারায় তাঁরা মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছেন। অথচ দাবি বিবেচনার বদলে তাঁদের ওপর লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর চাল, ডাল, তেল, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়েছে। ফলে এই আয়ে শ্রমিকদের পক্ষে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও পেনশন বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলেও শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা দ্বিচারিতা। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক চক্রান্ত বা বিরোধী দলের উসকানি হিসেবে চিহ্নিত করারও সমালোচনা করেন তিনি।
পোস্টে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তার তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। তবে সেই অজুহাতে হাজার হাজার শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁর অভিযোগ, শ্রমিকদের আন্দোলন দমনে পুলিশ ও বিজিবির লাঠিচার্জে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংবাদকর্মী ও সাধারণ পথচারীরাও হামলার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার এবং সহকর্মীর আটকের প্রতিবাদে ফেসবুকে মতামত প্রকাশের কারণে এক সাধারণ শ্রমিককে গ্রেপ্তারের ঘটনাও তুলে ধরেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
সরকারের গঠিত ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আন্দোলনের চাপের মুখে বোর্ড গঠন করা হলেও শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি। ২০২৩ সালেও ২৫ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির বিপরীতে দীর্ঘ আলোচনার পর ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবারও সময়ক্ষেপণের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বোর্ডে ক্ষমতাসীন দল-সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি রাখায় এর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মালিকপক্ষের বৈশ্বিক মন্দা ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির যুক্তি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ভালো সময়ে মুনাফা একা ভোগ করে সংকটের পুরো দায় শ্রমিকদের ওপর চাপানো গ্রহণযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্যমূল্য আদায় এবং পোশাক কারখানার মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনা সরকারের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ পোশাকশিল্প থেকে এলেও এই খাতের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর দাবি, প্রায় ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিকের শ্রমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়লেও তাঁদের অনেকের পক্ষে মাস শেষে পরিবারের ন্যূনতম ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
পোস্টের শেষাংশে নাহিদ ইসলাম শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ন্যায্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার দাবি জানান। পাশাপাশি গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি, পুলিশি হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, শ্রমিক ছাঁটাই ও কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।