আজ শেরে বাংলার ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী

অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক ও উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিক শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী আজ ২৬ অক্টোবর। ১৮৭৩ সালের এই দিনে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার সাতুরিয়া গ্রামে, বর্তমান ঝালকাঠিতে, জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, জমিদারি শোষণ মোকাবিলা, শিক্ষার প্রসার ও বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন শেরে বাংলা। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি পালনের আয়োজন করা হয়েছে।
কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা
শেরে বাংলার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলার কৃষক ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। ১৯৩৭ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেন তিনি।
তার সরকারের সময় ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনে সংশোধন আনা হয়। কৃষকদের জমিদারি শোষণ ও নানা ধরনের অবৈধ আদায় থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ঋণের বোঝা কমাতে ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বহু কৃষক ঋণসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি ও আর্থিক চাপ থেকে মুক্তির সুযোগ পান।
লাহোর প্রস্তাব ও জোট রাজনীতি
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন এ কে ফজলুল হক। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগের নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে তিনি দলটির বাইরে রাজনৈতিক অবস্থান নেন। ১৯৪১ সালে হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে জোট গঠন করে বাংলায় ‘শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন বাংলার জোট রাজনীতিতে এ উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
তার বলিষ্ঠ বক্তৃতা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে তিনি ‘শের-ই-বঙ্গাল’ বা ‘বাংলার বাঘ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এই উপাধিই পরবর্তী সময়ে তার নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
শিক্ষার প্রসারে অবদান
শিক্ষাকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতেন শেরে বাংলা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ, মুসলিম নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ এবং ঢাকার তেজগাঁওয়ে কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকাশে তার উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা উল্লেখযোগ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও এর জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন তৈরির ক্ষেত্রেও তার ভূমিকার কথা ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়। শিক্ষার প্রসারে তার উদ্যোগ তৎকালীন বাংলার মুসলিম সমাজসহ বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে।
যুক্তফ্রন্ট ও পূর্ব বাংলার রাজনীতি
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এ কে ফজলুল হক। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ অন্য নেতাদের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠনে ভূমিকা রাখেন তিনি। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
তবে অল্প সময়ের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার তার মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করে এবং পূর্ব বাংলায় গভর্নরের শাসন জারি করে। পরবর্তী সময়ে তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন নেতার মাজারে তাকে সমাহিত করা হয়। কৃষক-প্রজার অধিকার, শিক্ষার বিস্তার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য উপমহাদেশের ইতিহাসে তার অবদান আজও স্মরণ করা হয়।