আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় মেসির, শেষ ম্যাচে গোল করে আবেগঘন সমাপ্তি

২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন আর্জেন্টিনার ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি। বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবার মাঠে নামেন তিনি। ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে গোল করে বিদায়ের রাতটিকে আরও স্মরণীয় করে রাখেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা।
মেসির শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে হারিয়েছে বেনিনকে। এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে মেসির ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ম্যাচে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১২৬তম গোলটি করেন তিনি। এর আগে অভিজ্ঞ নিকোলাস ওটামেন্দির গোলে সহায়তা করেন মেসি। দলের অন্য গোলটি করেন নিকো পাজ।
তবে ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল মেসির বিদায়। ‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’ নামে আয়োজিত এই ম্যাচে শেষবারের মতো আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ভালোবাসা ও সম্মান গ্রহণ করেন তিনি।
ম্যাচ শেষে সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্যে মেসি বলেন, “২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জার্সি রক্ষা করতে পারা আমার জন্য বিশাল গর্বের বিষয়। এখানে আর না আসাটা ভীষণ কষ্টদায়ক হবে। আমি শপথ করে বলছি, সারা জীবন খেলতে চাই। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন মানুষের জীবনে ঘটতে পারে এমন সবচেয়ে সুন্দর বিষয়।”
অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অবশ্য কোনো আক্ষেপ নেই মেসির। সর্বশেষ বিশ্বকাপের কঠিন অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। মেসি বলেন, “যদিও আমি সারাজীবন এখানে থাকতে চাই, তবু আমার মনে হচ্ছে এটাই সঠিক সময়। সর্বশেষ বিশ্বকাপটা অনেক বেশি কঠিন ছিল, আমাকে অনেক কিছু পার করতে হয়েছে।”
বিদায়ের আগে মেসিকে আবেগাপ্লুত অবস্থায় দেখা যায়। স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে চোখের পানি মুছতে দেখা যায় তাকে। তাকে ও আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়দের বহনকারী বাস ঘিরে ছিল অসংখ্য সমর্থক।
মেসি তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন। ভিআইপি বক্স থেকে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি তাকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
ম্যাচ শুরুর আগে মাঠে বিছিয়ে দেওয়া হয় বিশাল আর্জেন্টিনার জার্সি। সেখানে মেসির ১০ নম্বরের ওপরে লেখা ছিল ‘Gracias’—অর্থাৎ ‘ধন্যবাদ’। গ্যালারি থেকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সেই আয়োজনকে স্বাগত জানান দর্শকেরা।
ফকল্যান্ডস যুদ্ধের সাবেক সেনা ফ্যাবিও সান্তানা জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময়ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মেসি। তার পাশে ছিল ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’ লেখা একটি ব্যানার। এর আগে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা একই ধরনের ব্যানার উঁচিয়ে ধরেছিলেন।
ম্যাচের ১০ মিনিটে মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিটের জন্য খেলা থামিয়ে তাকে করতালিতে অভিবাদন জানানো হয়। পরে ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন মেসি।
শেষ বাঁশির পর স্টেডিয়ামে শুরু হয় ড্রোন শো। রাতের আকাশে ভেসে ওঠে মেসির ছবি। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানানো হয় বিশেষ এই আয়োজনে।
বিদায়ের আগে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সদর দপ্তরে আরও একটি বিশেষ সম্মান পান মেসি। বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে। আরও বেশি পড়াশোনা না করার আক্ষেপের কথা আগে বললেও এই সম্মান পেয়ে গর্ব প্রকাশ করেন তিনি।
রসিকতা করে মেসি বলেন, “আমি বলতে পারব যে আমি একজন সম্মানসূচক ডাক্তার!”
এএফএর সদর দপ্তরের বাইরে সমর্থকেরা মেসির ছবি সংবলিত বিশাল আর্জেন্টাইন পতাকা মেলে ধরেন। সেখানে লেখা ছিল—‘আমার জীবনের আনন্দ’।
মেসির সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ নেইমারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাকে শ্রদ্ধা জানান। তিনি লেখেন, “শুধু আর্জেন্টিনাই নয়, ফুটবলের জন্য তুমি যা করেছ তার জন্য পুরো বিশ্ব তোমাকে ধন্যবাদ জানায়। আমাকে ফুটবলকে আরও বেশি ভালোবাসতে শেখানোর জন্য ধন্যবাদ।”
মেসির সঙ্গে ইন্টার মায়ামির চুক্তি ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে। তবে সম্প্রতি বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর তিনি প্রত্যাশার চেয়েও আগেই হয়তো ফুটবল থেকে পুরোপুরি সরে যেতে পারেন—এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সময় মেসির সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর কথা সামনে এসেছে। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশকে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবলে দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনা একটি বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে এবং দুবার রানার্সআপ হয়েছে—২০১৪ সালে ব্রাজিল ও ২০২৬ সালে উত্তর আমেরিকায়। এ ছাড়া ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপাও জিতেছে দলটি।