কারও নাম শুনেও কিছুক্ষণ পর ভুলে যান? জানুন কেন এমন হয়

নতুন কারও সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তার মুখ, পোশাক, পেশা কিংবা কোথায় দেখা হয়েছিল—অনেক কিছুই মনে থাকে। কথোপকথনের গুরুত্বপূর্ণ অংশও হয়তো মনে থাকে স্পষ্টভাবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ মনে হয়, মানুষটির নামটা কী যেন!
পরিচিত কারও সামনে এমন হলে সহজেই নাম ধরে ডাকা যায়। কিন্তু নতুন পরিচিত মানুষের ক্ষেত্রে নাম মনে না পড়লে অনেকেই অস্বস্তিতে পড়েন। কেউ আবার নামটি জানতে সরাসরি প্রশ্ন না করে কথাবার্তার মধ্যে ঘুরিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেন।
তবে নতুন পরিচিত মানুষের নাম ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। মানুষের স্মৃতির স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতার কারণেই এমনটা হতে পারে। বিশেষ করে নাম মনে রাখার ক্ষেত্রে মস্তিষ্ককে অন্য অনেক তথ্যের তুলনায় কিছুটা বেশি সমস্যায় পড়তে হয়।
নাম মনে রাখা কঠিন কেন?
এর একটি বড় কারণ হলো, ব্যক্তির নামের সঙ্গে তার পরিচয় বা বৈশিষ্ট্যের সরাসরি অর্থপূর্ণ সম্পর্ক সব সময় থাকে না।
ধরা যাক, নতুন পরিচিত কেউ জানালেন তিনি একজন স্থপতি। ‘স্থপতি’ শব্দটি শুনলে আপনার মনে ভবন, নকশা, নির্মাণকাজ বা অফিসের মতো বিভিন্ন ধারণা তৈরি হতে পারে। একইভাবে তিনি যদি বলেন, তিনি মিরপুরে থাকেন, তাহলে জায়গাটির সঙ্গে আপনার নিজের অভিজ্ঞতা বা পরিচিত কোনো তথ্য যুক্ত হতে পারে।
কিন্তু শুধু ‘রাফি’, ‘সাদিয়া’ বা ‘নাঈম’ নামটি শুনলে সেই শব্দটি সাধারণত ব্যক্তিটির চেহারা, পেশা বা স্বভাব সম্পর্কে সরাসরি কোনো ধারণা দেয় না। ফলে নামটি অন্য তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করে মনে রাখার সুযোগ তুলনামূলক কম থাকে।
মনোবিজ্ঞানে নতুন তথ্যকে আগের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে স্মৃতিতে সংরক্ষণের প্রক্রিয়াকে এনকোডিং বলা হয়। কোনো তথ্যের সঙ্গে যত বেশি অর্থপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়, পরে সেটি মনে করার সুযোগও তত বাড়তে পারে।
অ্যাসোসিয়েশন ফর সাইকোলজিক্যাল সায়েন্সে মনোবিজ্ঞানী লিস আব্রামস ও ড্যানিয়েল কে. ডেভিসের গবেষণা নিয়ে প্রকাশিত আলোচনায় বলা হয়েছে, অন্যান্য অনেক শব্দের তুলনায় মানুষের নাম শেখা ও মনে রাখা কঠিন হতে পারে। কারণ নামের সঙ্গে ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য বা অর্থের সরাসরি সম্পর্ক তুলনামূলক দুর্বল।
২০১৭ সালে Neuroscience and Biobehavioral Reviews-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনাতেও সাধারণ বিশেষ্যের তুলনায় ব্যক্তির নাম মনে রাখার ক্ষেত্রে মানুষের বেশি সমস্যার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে।
মুখ মনে থাকে, নাম থাকে না কেন?
কারও সঙ্গে প্রথমবার দেখা হলে একই সময়ে মস্তিষ্ককে অনেক তথ্য প্রক্রিয়া করতে হয়। সামনের মানুষটির চেহারা, কণ্ঠস্বর, পোশাক, কথাবার্তা ও আচরণ যেমন নজরে আসে, তেমনি নিজের কী বলা উচিত, সেটিও আমরা ভাবতে থাকি।
এই পরিস্থিতিতে পরিচয়ের সময় বলা নামটি হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমাদের মনোযোগ পায়। ফলে নামটি শোনার মুহূর্তে সেটি স্মৃতিতে ভালোভাবে সংরক্ষিত নাও হতে পারে।
এখানে মনোযোগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য স্মৃতিতে ধরে রাখার আগে সেটির প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ প্রয়োজন। তাই কারও নাম পরে মনে না পড়ার অর্থ এই নয় যে আপনি মানুষটির কথায় মনোযোগ দেননি। অনেক সময় নামটি প্রথমবার শোনার সময়ই যথেষ্টভাবে মস্তিষ্কে গেঁথে যায়নি।
অর্থাৎ সমস্যাটি সব সময় স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার নয়; বরং তথ্যটি শুরুতেই শক্তভাবে সংরক্ষিত না হওয়ার ফলও হতে পারে।
বেশি তথ্য জানলে কি নাম মনে রাখা কঠিন?
স্মৃতিবিজ্ঞানে ‘ফ্যান এফেক্ট’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। সহজভাবে বললে, একজন ব্যক্তির সঙ্গে যখন অনেক ধরনের তথ্য যুক্ত হয়, তখন নির্দিষ্ট কোনো একটি তথ্য মনে করতে মস্তিষ্ককে তুলনামূলক বেশি কাজ করতে হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কারও সম্পর্কে বেশি তথ্য জানা স্মৃতির জন্য খারাপ। বরং নামের সঙ্গে অর্থপূর্ণ কোনো তথ্য যুক্ত করা অনেক সময় নামটি মনে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
যেমন, ‘সাদিয়া’ নামটির সঙ্গে যদি মনে রাখেন—তিনি একজন স্থপতি এবং আপনাদের পরিচয় হয়েছে একটি সেমিনারে—তাহলে নামটি আলাদা কোনো তথ্য হিসেবে না থেকে মুখ, পেশা ও পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। পরে নামটি মনে করার সময় এই তথ্যগুলো স্মৃতির জন্য সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।
Applied Cognitive Psychology-এ প্রকাশিত গবেষণাতেও নাম মনে করার অনুশীলন এবং নামের সঙ্গে অর্থপূর্ণ তথ্যের যোগসূত্র তৈরির উপকারিতার কথা উঠে এসেছে।
নাম মনে রাখার সহজ কৌশল
নতুন কারও নাম শোনার পর সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে নামটি একবার পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। কথোপকথনের উপযুক্ত জায়গায় স্বাভাবিকভাবেও নামটি ব্যবহার করা যায়।
কেউ যদি বলেন, ‘আমি সাদিয়া’, তাহলে আপনি বলতে পারেন, ‘সাদিয়া, আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।’ এতে নামটি শুধু একবার শোনা হয় না, কথোপকথনের সঙ্গে আরও একবার যুক্ত হয়।
এ ছাড়া নামটির সঙ্গে ব্যক্তির কোনো বৈশিষ্ট্য, পেশা, পরিচিত জায়গা বা পরিচয়ের পরিস্থিতি যুক্ত করে মনে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। এতে একটি নামের সঙ্গে মুখ, তথ্য ও পরিস্থিতির মধ্যে একাধিক সংযোগ তৈরি হয়।
নাম ভুলে গেলে আবার জিজ্ঞেস করুন
নাম ভুলে গেলে বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত অস্বস্তিতে পড়ার প্রয়োজন নেই। বরং স্বাভাবিকভাবে আবার জিজ্ঞেস করাই সবচেয়ে সহজ উপায়।
‘দুঃখিত, আপনার নামটা আরেকবার বলবেন?’
এভাবে জানতে চাওয়ায় বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। বরং নামটি অনুমান করে ভুল নামে ডাকার চেয়ে সরাসরি জেনে নেওয়াই ভালো।
মানুষের স্মৃতি কোনো নিখুঁত রেকর্ডিং মেশিন নয়। আমরা সব তথ্য সমানভাবে সংরক্ষণ করি না। কোন তথ্যের প্রতি কতটা মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটির সঙ্গে পুরোনো অভিজ্ঞতার কী ধরনের সংযোগ তৈরি হয়েছে এবং সেই মুহূর্তে আমাদের মনোযোগ কোথায় ছিল—এসবের ওপর স্মৃতি অনেকটাই নির্ভর করে।
তাই নতুন পরিচিত কারও নাম ভুলে গেলে নিজেকে নিয়ে অস্বস্তিতে না পড়ে নামটি আবার জেনে নিন। আর নাম মনে রাখার জন্য শুরুতেই সেটিকে মুখ, পরিচয় ও কোনো অর্থপূর্ণ তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করার অভ্যাস করুন।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, মিডিয়াম