নতুন রূপে বিটিভি, লোগো বদল ঘিরে দর্শকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটি ‘ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি!’ স্লোগানে নতুন লোগোর আইডিয়া ও নকশা আহ্বান করেছে। তবে এ উদ্যোগ সামনে আসার পর দর্শকদের একটি বড় অংশ পুরোনো লোগো পরিবর্তনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, বিটিভির বর্তমান লোগোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক প্রজন্মের শৈশব, স্মৃতি ও ঐতিহ্য।
গত ৩০ আগস্ট বিটিভির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নতুন লোগো তৈরির উদ্যোগ জানিয়ে একটি প্রচারণামূলক ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে সাধারণ মানুষ ও ডিজাইনারদের কাছ থেকে নতুন লোগোর ধারণা ও নকশা চাওয়া হয়েছে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে logo@btv.gov.bd ই-মেইল ঠিকানায় নকশা পাঠাতে বলা হয়েছে।
বিটিভির এই আহ্বানের পর ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে নিজেদের মতামত জানাচ্ছেন দর্শকরা। তাদের অনেকেই বলছেন, বর্তমান লোগোটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়চিহ্ন নয়; এর সঙ্গে তাদের বেড়ে ওঠা, পারিবারিক বিনোদন এবং টেলিভিশন দেখার পুরোনো দিনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাই লোগোটি পুরোপুরি পরিবর্তনের পরিবর্তে এর মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা।
কেউ কেউ অবশ্য বিটিভির আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। তাদের পরামর্শ, পুরোনো লোগোর পরিচিত বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে সেটিতে আধুনিক নকশা, গ্রাফিক্স বা থ্রিডি উপস্থাপন যুক্ত করা যেতে পারে। এতে ঐতিহ্যও থাকবে, আবার নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও প্রতিষ্ঠানটির উপস্থাপন আরও আধুনিক হয়ে উঠবে।
লোগো পরিবর্তনের পাশাপাশি বিটিভির সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়েও দর্শকদের প্রত্যাশা উঠে এসেছে। নতুন চ্যানেল চালু, বিশেষ করে ক্রীড়া সম্প্রচারের জন্য আলাদা চ্যানেল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন কেউ কেউ। ঘরোয়া ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলা নিয়মিত সম্প্রচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটির দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শও এসেছে।
আধুনিক বিটিভির পরিকল্পনা
লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগের আগে বিটিভির আধুনিকায়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিন। পরে নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে ওই সাক্ষাতের ছবি প্রকাশ করে তিনি জানান, বিটিভিকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বড় পরিকল্পনা রয়েছে।
মহাপরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বিটিভিকে একটি বিশ্বাসযোগ্য, আধুনিক ও জনআস্থার সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে দেখতে চান। বিটিভির অতীত ভূমিকা, দর্শকের আস্থা এবং প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ওই সাক্ষাতে বিভিন্ন বিষয় আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিটিভির মহাপরিচালক আরও দাবি করেন, অতীতে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমতাসীনদের প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছিল। তার মতে, এখন প্রতিষ্ঠানটিকে আরও আধুনিক, মর্যাদাপূর্ণ ও জনমুখী করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে বর্তমান লোগো
বিটিভির বর্তমান লোগোর সঙ্গেও দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সবুজ বেষ্টনীর মধ্যে উদীয়মান লাল সূর্যের প্রতীকসমৃদ্ধ এই লোগোর নকশার সঙ্গে শিল্পী ইমদাদ হোসেন, কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার ও মহিউদ্দিন ফারুকের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে।
১৯৮০ সালে বিটিভি রঙিন সম্প্রচারে যাওয়ার সময় লোগোটির রঙিন রূপ ব্যবহারের তথ্যও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতীকটি বাংলাদেশের টেলিভিশন দর্শকদের কাছে পরিচিত একটি দৃশ্যচিহ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এ কারণে নতুন লোগো তৈরির উদ্যোগটি কেবল একটি গ্রাফিক নকশা পরিবর্তনের বিষয় হিসেবে দেখছেন না দর্শকদের অনেকে। তাদের কাছে এটি বিটিভির দীর্ঘ ইতিহাস ও পরিচিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
অন্যদিকে, পরিবর্তনের পক্ষের যুক্তি হলো—সময়ের সঙ্গে একটি সম্প্রচারমাধ্যমের উপস্থাপন ও ভিজ্যুয়াল পরিচয়েও আধুনিকতার ছাপ থাকা প্রয়োজন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নতুন প্রজন্মের দর্শকদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিটিভির ব্র্যান্ড পরিচয় নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, আধুনিকায়নের এই প্রক্রিয়ায় বিটিভি তার ঐতিহ্য কতটা ধরে রাখতে পারবে। পুরোনো লোগোর আবেগ ও পরিচিতি অক্ষুণ্ন রেখে নতুন প্রজন্মের উপযোগী একটি নকশা তৈরি করা সম্ভব হলে সেটিই হয়তো হতে পারে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পথ।
আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন লোগোর আইডিয়া ও নকশা জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জমা পড়া প্রস্তাব কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত বর্তমান লোগো পরিবর্তন করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।