মৃত্যুর ২৯ বছর পরও কেন অমলিন প্রিন্সেস ডায়ানা

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে পরিচিত রাজপরিবারের সদস্যদের তালিকায় প্রিন্সেস ডায়ানার নাম আজও উজ্জ্বল। সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্যও তিনি মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য হয়েও সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার যে প্রবণতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
তবে তার ব্যক্তিজীবন ছিল নানা টানাপোড়েনে ভরা। রাজকীয় বিয়ে, দাম্পত্য সংকট, বিচ্ছেদ এবং শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু—সব মিলিয়ে ডায়ানার জীবন যেন বাস্তবের এক অসমাপ্ত গল্প।
অভিজাত পরিবারে জন্ম
১৯৬১ সালের ১ জুলাই এডওয়ার্ড জন স্পেন্সার ও ফ্রান্সেস স্পেন্সারের ঘরে জন্ম নেন ডায়ানা। তিনি ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী স্পেন্সার পরিবারের সন্তান ছিলেন। পরিবারটির সঙ্গে ব্রিটিশ অভিজাত সমাজের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে।
ডায়ানার শৈশব কেটেছে রাজপরিবারের কাছাকাছি পরিবেশে। তার পরিবার যে ‘পার্ক হাউজ’-এ থাকত, সেটি ছিল রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মালিকানাধীন সম্পত্তি। ছোটবেলায় রাজপরিবারের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গেও তার পরিচয় হয়েছিল।
১৯৬৯ সালে ডায়ানার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। পরে বাবার কাছেই তার বেড়ে ওঠা। শিক্ষাজীবনে বিভিন্ন বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি।
রাজপুত্র চার্লসের সঙ্গে পরিচয় ও বিয়ে
কৈশোরে চার্লসের সঙ্গে পরিচয় থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাদের যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। লন্ডনে থাকার সময় আবারও তাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়।
চার্লস ও ডায়ানার সম্পর্ক দ্রুতই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে জমকালো আয়োজনে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর ডায়ানা ‘প্রিন্সেস অব ওয়েলস’ উপাধি লাভ করেন।
এই রাজকীয় বিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। তরুণী ডায়ানার সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্ব তাকে খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে।
দুই সন্তানের মা ডায়ানা
চার্লস ও ডায়ানার দুই ছেলে—প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারি। ১৯৮২ সালে উইলিয়াম এবং ১৯৮৪ সালে হ্যারি জন্মগ্রহণ করেন।
সন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রে ডায়ানা রাজপরিবারের প্রচলিত রীতির তুলনায় কিছুটা ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছিলেন। তিনি তাদের সাধারণ মানুষের জীবন ও সমাজের নানা বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করার চেষ্টা করেন।
মানবিক কাজেই আলাদা পরিচিতি
ডায়ানার জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় কারণ ছিল তার মানবিক কর্মকাণ্ড। শিশুদের কল্যাণ, দাতব্য কার্যক্রম, এইচআইভি/এইডস বিষয়ে সচেতনতা এবং স্থলমাইনবিরোধী প্রচারে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যের একটি এইচআইভি/এইডস ইউনিট উদ্বোধনের সময় আক্রান্ত এক ব্যক্তির সঙ্গে প্রকাশ্যে হাত মেলান তিনি। সে সময় এইডস ছোঁয়াচে রোগ—এমন ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত ছিল। ডায়ানার এই পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্থলমাইন ব্যবহারের বিরুদ্ধেও তিনি আন্তর্জাতিকভাবে জনমত তৈরিতে কাজ করেন। তার এসব কর্মকাণ্ড রাজপরিবারের গণ্ডির বাইরে তাকে একজন মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
দাম্পত্য জীবনে সংকট
জনপ্রিয়তার বিপরীতে ডায়ানার ব্যক্তিজীবনে ক্রমেই সংকট বাড়তে থাকে। চার্লসের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কে নানা সমস্যা ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ তাদের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়।
১৯৯২ সালে চার্লস ও ডায়ানা আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা থাকার ঘোষণা দেন। এরপরও তারা কিছু সময় রাজকীয় দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৬ সালের আগস্টে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়। বিচ্ছেদের পরও ডায়ানা ‘প্রিন্সেস অব ওয়েলস’ উপাধি ব্যবহার করেন। রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের বাইরে এসে তিনি মানবিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
দোদি আল-ফায়েদের সঙ্গে সম্পর্ক
বিবাহবিচ্ছেদের পর মিসরীয় চলচ্চিত্র প্রযোজক দোদি আল-ফায়েদের সঙ্গে ডায়ানার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তাদের সম্পর্ক দ্রুত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় আসে।
ডায়ানা ও দোদির গতিবিধির ওপর সারাক্ষণ নজর রাখতেন পাপারাজ্জিরা। তাদের ছবি পাওয়ার জন্য আলোকচিত্রীরা নিয়মিত অনুসরণ করতেন এই জুটিকে।
যেভাবে মৃত্যু হয় ডায়ানার
১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রাতে প্যারিসে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন ডায়ানা। সেদিন তিনি দোদি আল-ফায়েদের সঙ্গে রিটজ প্যারিস হোটেলে ছিলেন।
রাতের খাবার শেষে তারা হোটেল থেকে একটি মার্সিডিজ গাড়িতে করে বের হন। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন অঁরি পল। তাদের সঙ্গে ছিলেন ডায়ানার দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোনস।
পাপারাজ্জিদের অনুসরণ এড়াতে গাড়িটি দ্রুতগতিতে চলছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১৯ মিনিটের দিকে প্যারিসের পঁ দ্য লমা সেতুর একটি স্তম্ভে গাড়িটি ধাক্কা খায়।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান দোদি আল-ফায়েদ ও চালক অঁরি পল। গুরুতর আহত ডায়ানাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভোরের দিকে ৩৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোনস গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান।
মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে শোক
ডায়ানার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শোকের সৃষ্টি হয়। ব্রিটেনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
তার শেষকৃত্যে লন্ডনের রাস্তায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে অনুষ্ঠিত হয় আনুষ্ঠানিক শেষকৃত্য। পরে নর্থহ্যাম্পটনশায়ারে স্পেন্সার পরিবারের সম্পত্তি আলথর্পে তাকে সমাহিত করা হয়।
তদন্তে কী উঠে আসে
ডায়ানার মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও সরকারি তদন্তে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়।
তদন্তে বলা হয়, গাড়িচালক অঁরি পল মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং গাড়ির গতি ছিল অত্যন্ত বেশি। একই সঙ্গে পাপারাজ্জিদের অনুসরণও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তী ব্রিটিশ তদন্তে চালক ও পাপারাজ্জিদের ‘চরম অবহেলা’র কারণে ডায়ানা ও দোদির মৃত্যু হয়েছে বলে জুরি সিদ্ধান্ত দেয়। তাদের মৃত্যু আইনি ভাষায় ‘অবৈধ হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এ ঘটনায় কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি।
রাজপরিবারে ডায়ানার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
মৃত্যুর পরও ব্রিটিশ রাজপরিবার ও বিশ্বজুড়ে ডায়ানার প্রভাব স্পষ্ট। তার দুই ছেলে উইলিয়াম ও হ্যারি বিভিন্ন মানবিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে মায়ের কাজের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন।
এইচআইভি/এইডস বিষয়ে সচেতনতা, মানবিক সহায়তা, শিশুদের কল্যাণ এবং স্থলমাইনবিরোধী প্রচারে ডায়ানার ভূমিকা আজও স্মরণ করা হয়।
ব্রিটিশ রাজপরিবারকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও ডায়ানার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অনেক ইতিহাসবিদ ও জীবনীকার।
সৌন্দর্য ও রাজকীয় পরিচয়ের বাইরেও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য যে মানবিক পরিচয় তিনি তৈরি করেছিলেন, সেটিই মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও প্রিন্সেস ডায়ানাকে বিশ্বজুড়ে স্মরণীয় করে রেখেছে।