৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি ভোট আজ

১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর আবারও সরাসরি ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। এবারের নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
দুই প্রার্থীর কেউই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় রাষ্ট্রপতি পদে এবার ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট চলবে। ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ কক্ষেই ব্যালট গণনা করা হবে। গণনা শেষে নির্বাচনি কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করবেন। পরে নির্বাচন কমিশন থেকে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।
সংসদে কার কত ভোট
জাতীয় সংসদের মোট আসন ৩৫০টি। তবে চট্টগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়ায় এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জনে।
বর্তমানে সংসদে বিএনপির ২৪৭ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৮ জন, স্বতন্ত্র ৮ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩ জন এবং অন্যান্য ছোট দলের ৬ জন সদস্য রয়েছেন।
সংসদীয় সংখ্যার হিসাবে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে। ফলে সংখ্যার বিচারে অলি আহমদের তুলনায় মির্জা ফখরুলের অবস্থান শক্তিশালী হলেও আইন অনুযায়ী দুই প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনার মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করতে হবে।
৩৫ বছর পর আবার কেন ভোট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের মনোনীত প্রার্থীই নির্বাচিত হয়ে থাকেন। ফলে গত কয়েক দশকে একাধিক প্রার্থী না থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। একজন প্রার্থী থাকায় তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে এবার দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকায় সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল।
যেভাবে হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার কেবল জাতীয় সংসদ সদস্যদের। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষেই ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং আরেকজন সমর্থক হিসেবে থাকতে হয়।
প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট থাকবে। স্পিকারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। সর্বাধিক বৈধ ভোট পাওয়া প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ভোট সমান হলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
ভোটগ্রহণের সময় ও পদ্ধতি
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে। ভোট শুরুর আগে নির্বাচনি কর্তা ও সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার পদ্ধতি বুঝিয়ে দেবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালটে দুই অংশ থাকবে। একটি অংশে থাকবে ব্যালটের ক্রমিক নম্বর, সংসদ সদস্যের নাম ও বিভক্তি নম্বর। অন্য অংশে থাকবে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর নাম।
নির্ধারিত স্থানে সংসদ সদস্যকে নিজের পূর্ণ নাম লিখে ও স্বাক্ষর করে ভোট দিতে হবে। এরপর ব্যালট নির্ধারিত বাক্সে জমা দিতে হবে। ব্যালটের রং হবে সাদার ওপর কালো ছাপা।
ভোটগ্রহণের জন্য সংসদ কক্ষে তিনটি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভোট শেষ হওয়ার পর সংসদ কক্ষেই ব্যালট বাক্স খোলা ও ভোট গণনা করা হবে।
কে কাকে ভোট দিয়েছেন জানা যাবে
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটারের গোপনীয়তা সাধারণ নির্বাচনের মতো নয়। সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা জানা সম্ভব হবে।
সিইসি ও নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হবে ‘ওপেন’ ব্যালটে। ফলে কে কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে দৃশ্যমান থাকবে।
এ বিষয়টি নিয়ে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়েও রাজনৈতিক ও আইনগত আলোচনা হয়েছে। কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদীয় কার্যক্রমের সাধারণ ভোট নয়; এটি একটি পৃথক সাংবিধানিক নির্বাচন। এ কারণে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এ নিয়ে আদালতে রিট হলেও তফসিল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানে এখন আর কোনো আইনি বাধা নেই।
সংসদ কক্ষে প্রচারণা নিষিদ্ধ
ভোটগ্রহণের সময় সংসদ কক্ষে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচার, বক্তব্য বা ভাষণ দেওয়া যাবে না। সিইসি জানিয়েছেন, ভোটের সময় সংসদ কক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সুযোগ নেই।
তবে সংসদ ভবনের বাইরে প্রচারণার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত আইনে আলাদা কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
ভোটের ফল জানা যাবে আজই
বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই সংসদ কক্ষে ব্যালট গণনা শুরু হবে। প্রথমে কতজন সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন, কতটি ব্যালট বৈধ ও বাতিল হয়েছে এবং কতটি ব্যালট অব্যবহৃত রয়েছে, তার হিসাব করা হবে।
এরপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা কতটি বৈধ ভোট পেয়েছেন, তা গণনা করা হবে। সর্বাধিক বৈধ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচনি কর্তা বিজয়ী ঘোষণা করবেন।
অর্থাৎ ফলাফলের জন্য পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরই ফল ঘোষণা করা হবে। পরে নির্বাচন কমিশন ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করবে।
শুক্রবার শপথ নেওয়ার কথা
নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যায় নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এ তথ্য জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই নবনির্বাচিত ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ কত বছর
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকেন। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত মেয়াদ শেষ হলেও তিনি পদে বহাল থাকবেন।
একজন ব্যক্তি একাদিক্রমে বা অন্যভাবে দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
তফসিল ঘোষণা হয়েছিল ৬ আগস্ট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ৬ আগস্ট। তফসিল অনুযায়ী, ৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় নির্ধারিত ছিল।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় আজ ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন নির্বাচন
২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়। এরপর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে নির্বাচন কমিশন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে সংসদীয় আসন শূন্য হবে
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমানে জাতীয় সংসদের সদস্য। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে।
পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে ওই আসনে উপনির্বাচনের আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। সংসদীয় ব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা হলেও রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন, সংসদ আহ্বান ও অধিবেশন সমাপ্তির ক্ষেত্রে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন এবং সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দেন। সংবিধান ও আইনে নির্ধারিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও রাষ্ট্রপতি পালন করেন। পাশাপাশি তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছিলেন যারা
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি তাদের তৎকালীন স্পিকার আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে প্রার্থী করেছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জিয়াউর রহমানের সরকারে মন্ত্রী এবং পরে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি বিরোধী দল। তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল তারা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিকের পরিবর্তে নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বসানোর দাবি জানানো হয়।
বিএনপি প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করে। শেষ পর্যন্ত ওই নির্বাচনেই দুই প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি ভোট হয়েছিল।
এরপর যাঁরা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রপতি করে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। পরে রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতির জেরে তিনি পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন ইয়াজউদ্দিন আহমদ।
২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় ইয়াজউদ্দিন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। এরপর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি হন জিল্লুর রহমান। ২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত এবং পরে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ আবদুল হামিদ।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। তাঁর মেয়াদ শেষ হলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর পদত্যাগের পর এবার নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।