ইসলাম কি নারীর গাড়ি চালানোকে বৈধ মনে করে, জেনে নিন শর্তগুলো

নারীর গাড়ি চালানো নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে—ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারী কি নিজে গাড়ি চালাতে পারবেন? ইসলামি ফতোয়া ও শরিয়তের সাধারণ নীতিমালা অনুযায়ী, নিরাপত্তা, শালীনতা ও অন্যান্য শরিয়তসম্মত বিষয় নিশ্চিত থাকলে নারীর গাড়ি চালানো বৈধ।
কাতারের আওকাফ ও ইসলামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ফতোয়া বিষয়ক ওয়েবসাইট ইসলামওয়েবেও বলা হয়েছে, নারী গাড়ি চালাতে পারেন। তবে গাড়ি চালানোর কারণে যদি শরিয়তবিরোধী কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেমন পরপুরুষের সঙ্গে নির্জনে থাকা কিংবা এমন সফরে যাওয়া যাতে শরিয়তের নির্ধারিত সফরের বিধান প্রযোজ্য হয়, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হবে।
নারীর গাড়ি চালানোর মূলনীতি
ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর জন্য স্বাভাবিক যানবাহনে চলাচল বৈধ। তাই অন্যান্য যানবাহনে নারীর যাতায়াত বৈধ হওয়ার মতোই প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে গাড়ি চালানোও বৈধ বলে আলেমরা উল্লেখ করেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে নারীরা তৎকালীন প্রচলিত বিভিন্ন বাহনে যাতায়াত করতেন। এ বিষয়ে হাদিসেও প্রমাণ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘উষ্ট্রারোহী নারীদের মধ্যে কুরাইশের নেক নারীরাই সর্বোত্তম। তারা সন্তানের প্রতি শৈশবে অত্যন্ত স্নেহশীল এবং স্বামীর সম্পদের উত্তম হেফাজতকারী।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
তাই কোনো নারী গাড়ি চালালে এবং তা শরিয়তের দৃষ্টিতে সফরের পর্যায়ে না পড়লে, পরপুরুষের সঙ্গে নির্জন অবস্থার সৃষ্টি না হলে কিংবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি না হলে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে বাধা নেই।
বিশেষ প্রয়োজনেও নারী গাড়ি চালাতে পারেন। যেমন—স্বামী অসুস্থ, গাড়ি চালানোর সক্ষমতা নেই এবং তাকে হাসপাতালে বা অন্য কোথাও নেওয়ার জন্য কোনো মাহরাম পুরুষও উপস্থিত নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিরাপদভাবে নারী নিজেই গাড়ি চালিয়ে যেতে পারেন।
নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে
নারীর চলাফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোথাও পায়ে হেঁটে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হলে এবং তাকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার মতো কোনো মাহরাম ব্যক্তি না থাকলে, নিজে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে।
অর্থাৎ নারীর গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো পরিবেশ ও পরিস্থিতি। নিরাপদভাবে চলাচলের সুযোগ থাকা, শরিয়তবিরোধী কোনো পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা এবং ইসলামি শালীনতা বজায় রাখার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।
দূরপাল্লার সফরে মাহরামের বিধান
ইসলামে নারীর দূরপাল্লার সফরের ক্ষেত্রে মাহরামের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো নারী যেন মাহরাম ব্যক্তি ছাড়া তিন দিনের দূরত্বের সফর না করে।’ (সহিহ মুসলিম)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘কোনো মুসলিম নারীর জন্য তার মাহরাম পুরুষ ছাড়া এক রাতের পথও সফর করা বৈধ নয়।’ (সহিহ মুসলিম)
তাই কোনো যাত্রা শরিয়তের নির্ধারিত সফরের পর্যায়ে পড়লে সেখানে প্রযোজ্য মাহরামের বিধান বিবেচনা করতে হবে।
শালীনতা ও পর্দা বজায় রাখা
গাড়ি চালানোর সময় নারীর পোশাক, শালীনতা ও পর্দার বিষয়টিও ইসলামের সাধারণ নির্দেশনার আলোকে বিবেচনা করতে হবে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিনদের নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তারা উত্যক্ত হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আহযাব, আয়াত: ৫৯)
তাই গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রেও নারীর জন্য ইসলাম নির্ধারিত শালীনতা ও পর্দার বিধান মেনে চলা জরুরি।
পরপুরুষের সঙ্গে নির্জনতা এড়ানো
গাড়িতে অপরিচিত বা পরপুরুষের সঙ্গে এমন একান্ত পরিবেশ তৈরি করা যাবে না, যা ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নির্জনতার পর্যায়ে পড়ে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে। কারণ তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (তিরমিজি)
সুতরাং নারীর গাড়ি চালানো নিজে নিষিদ্ধ নয়। তবে এর সঙ্গে নিরাপত্তা, শালীনতা, পর্দা, মাহরাম এবং পরপুরুষের সঙ্গে নির্জনতা এড়িয়ে চলার মতো শরিয়তসম্মত বিধানগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।