তেহরান কি ওয়াশিংটনকে লক্ষ্য করে ICBM বানাচ্ছে, কতটা এগিয়েছে ইরান?

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বে। তেহরানের কাছে বর্তমানে মধ্যম ও দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ICBM তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে কি না, তা নিয়ে এখনো রয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। তবে দেশটির মহাকাশ কর্মসূচি, রকেট প্রযুক্তি এবং দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে জ্বালানি পরিবহনে তৈরি হওয়া ঝুঁকি এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোর ওপর ইরানের কৌশলগত প্রভাব রয়েছে। ফলে তেহরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়লে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের যুক্তি
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্বেগ রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সামরিক পদক্ষেপের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তেহরান ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির দিকে এগোচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও অতীতে ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে এসব দাবির বিপরীতে ইরান বরাবরই নিজেদের ICBM কর্মসূচির কথা অস্বীকার করে আসছে।
ICBM আসলে কী?
আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ICBM হলো এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা সাধারণভাবে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মহাদেশ পেরিয়ে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
ICBM সাধারণত পরমাণু ওয়ারহেড বহনের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে বিশ্বের কয়েকটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের হাতে কার্যকর ICBM রয়েছে। এ কারণেই কোনো দেশ এই ধরনের অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছালে তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে ICBM থাকলেই কোনো দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে—এমনটা অবধারিত নয়। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রচলিত ওয়ারহেডও বহন করতে পারে।
ইরানের হাতে এখন কী আছে?
ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে খোররামশাহর অন্যতম। এর পরীক্ষিত পাল্লা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া তেহরানের হাতে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার কিলোমিটার পাল্লার বিভিন্ন মাঝারি-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং ইউরোপের কিছু অংশে আঘাত হানার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে হলে এর চেয়ে অনেক বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।
ICBM তৈরির সক্ষমতা কতটা কাছে?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইরান এখন পর্যন্ত কার্যকর ICBM মোতায়েন করেছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই।
তবে দেশটির মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য ব্যবহৃত রকেট প্রযুক্তির কিছু অংশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও কাজে লাগানো সম্ভব। ফলে ইরানের স্পেস লঞ্চ ভেহিকল বা SLV কর্মসূচিকে ভবিষ্যৎ দীর্ঘপাল্লার সামরিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মূল্যায়নেও ইরানের মহাকাশ কর্মসূচির প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। সেখানে ভবিষ্যতে দেশটি ICBM সক্ষমতা অর্জন করতে পারে বলে সম্ভাবনার কথা উঠে আসে।
তবে ইরান বর্তমানে সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে—এমন দাবি করার মতো প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সীমিত।
১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আলোচনা
সম্প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্যের খবর সামনে এসেছে। এমন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের ভূখণ্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় যেকোনো অঞ্চলে পৌঁছানোর সক্ষমতা রাখবে।
তবে বক্তব্য বা পরিকল্পনার আলোচনা আর বাস্তবে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও পরীক্ষার সক্ষমতা অর্জন—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি কার্যকর ICBM তৈরির জন্য শুধু দীর্ঘপাল্লার রকেট থাকলেই হয় না। প্রয়োজন উন্নত প্রপালশন, গাইডেন্স, পুনঃপ্রবেশ প্রযুক্তি, নির্ভুলতা এবং ওয়ারহেড বহনের সক্ষমতা।
উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির বিকাশে বিদেশি প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ইরানের পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র সহযোগিতার বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
ইরানের খোররামশাহর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত শিকড় উত্তর কোরিয়ার হোয়াসং-১০ এবং আরও পুরোনো সোভিয়েত প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া ইতিমধ্যে হোয়াসং-১৮ ও হোয়াসং-১৯-এর মতো দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। এসব প্রযুক্তি থেকে ইরান ভবিষ্যতে কোনোভাবে সুবিধা নিতে পারে কি না, সেটিও পশ্চিমা বিশ্লেষকদের নজরে রয়েছে।
তবে সরাসরি রাশিয়া বা উত্তর কোরিয়া থেকে ইরানের কাছে ICBM প্রযুক্তি হস্তান্তর হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে প্রকাশ্য প্রমাণ সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ
ইরানের ICBM সক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন এক নয়। Arms Control Association-এর নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল মনে করেন, ইরানের সম্ভাব্য ICBM কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অতিরঞ্জিত।
তার যুক্তি, ইরানের হাতে আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে ঠিকই, কিন্তু দেশটির কাছে বর্তমানে কার্যকর ICBM সক্ষমতা নেই। একই সঙ্গে এমন ক্ষেপণাস্ত্রে বহনের মতো কার্যকর পারমাণবিক ওয়ারহেডও ইরানের হাতে নেই বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে Foundation for Defense of Democracies-এর ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বেনহাম বেন তালেব্লু মনে করেন, তেহরান তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্প্রসারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আন্তঃমহাদেশীয় সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনাও তাই পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
গোয়েন্দা পূর্বাভাস নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছে। এমনকি ১৯৯৯ সালের একটি মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইরান ২০১০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকিতে ফেলতে সক্ষম ICBM পরীক্ষার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
কিন্তু সেই পূর্বাভাস বাস্তবে সত্যি হয়নি।
এ কারণেই বর্তমানের গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক বক্তব্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি। ইরানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যে বাড়ছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ কম। কিন্তু সেই সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম পূর্ণাঙ্গ ICBM-এ রূপ নিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
বদলে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য
ইরান যদি ভবিষ্যতে সত্যিই কার্যকর ICBM তৈরি করতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা মূলত আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ও মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে কেন্দ্র করে। ICBM সক্ষমতা অর্জন করলে সেই পরিধি মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাবে।
তবে তেহরানের এমন সক্ষমতা অর্জনের পথে প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাজনিত বড় বাধা রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য, গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং বাস্তব প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে এক করে দেখা যাবে না। তেহরান ভবিষ্যতে ICBM তৈরির দিকে এগোচ্ছে কি না, সেটি নির্ধারণে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, রকেট প্রযুক্তির অগ্রগতি, উৎক্ষেপণ সক্ষমতা এবং ওয়ারহেড বহনের প্রযুক্তি—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্তমানে তাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত মূল্যায়ন হলো—ইরানের হাতে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম কার্যকর ICBM রয়েছে, এমন প্রমাণ নেই; তবে দেশটির রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অগ্রগতি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও দিচ্ছে না।