মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

এদেশে বিনয় মানেই কি দুর্বলতা?

এদেশে বিনয় মানেই কি দুর্বলতা?
এ আই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আমাদের সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে বিনয় বা নম্রতাকে একটি মহৎ গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, বাস্তব জীবনে এর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক সামাজিক ও করপোরেট কাঠামোতে শান্ত, ভদ্র ও বিনয়ী মানুষকে প্রায়শই শক্তিশালী নয়, বরং ‘দুর্বল’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কর্মক্ষেত্র, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিনয়ী মানুষদের মতামতকে এড়িয়ে গিয়ে তাদের ওপর প্রভাব খাটানোর একটি নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে সমাজে এই ভুল ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে—উচ্চস্বরে কথা বলা বা কঠোর আচরণ করাই বুঝি আত্মবিশ্বাসের একমাত্র পরিচয়।

কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণ ও দক্ষিণ এশীয় সমাজকাঠামো

সামাজিক মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক কাঠামোতে মানুষ প্রায়শই কর্তৃত্বপরায়ণ বা আগ্রাসী আচরণকে শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। যেসব সমাজে ক্ষমতার দূরত্ব (Power Distance) বেশি, সেখানে নম্র স্বভাবের মানুষকে সহজ লক্ষ্য (Soft Target) মনে করা হয়। বাংলাদেশি কর্মসংস্কৃতি নিয়ে করা কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিনয়ী কর্মীরা অনেক সময় তাদের যোগ্য প্রাপ্য ও স্বীকৃতি পান না, কারণ তারা নিজেদের প্রচার বা ‘সেলফ-প্রমোশন’ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এর ফলে কাজের চেয়ে আত্মপ্রচারমূলক ব্যক্তিরা দ্রুত এগিয়ে যায় এবং সমাজে একটি ভুল বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, বিনয় মানেই দক্ষতার অভাব।

দৃশ্যমান আত্মবিশ্বাস বনাম প্রকৃত সক্ষমতা

মনোবিজ্ঞান বলছে, মানুষের একটি সাধারণ জৈবিক প্রবণতা হলো উচ্চকণ্ঠ বা দৃশ্যমান আত্মবিশ্বাসকে প্রকৃত সক্ষমতা মনে করা, যদিও বাস্তবে তা সবসময় সত্য নয়। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর (Harvard Business Review) একটি আচরণগত গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, শান্ত ও বিনয়ী নেতারা দীর্ঘমেয়াদে অহংকারী নেতাদের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এমনকি ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও নৈতিক দর্শনেও বিনয়কে প্রকৃত শক্তির নিদর্শন বলা হয়েছে; কারণ নিজের আবেগকে দমন ও আত্মসংযম করা কোনো দুর্বল মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

তরুণ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব

সামাজিক বাস্তবতায় ভদ্র মানুষকে বারবার অবমূল্যায়ন বা ব্যবহার করার (Take for granted) চেষ্টা করার ফলে এর একটি বড় খেসারত দিতে হচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে। অনেক তরুণই এখন সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার কৌশল হিসেবে নম্রতার বদলে আগ্রাসী আচরণকে বেছে নিচ্ছে। এতে সমাজ দিন দিন আরও বেশি অসহিষ্ণু ও কঠোর হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও উত্তরণের উপায়

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শক্তি মানে কণ্ঠস্বর উঁচু করা বা অহংকার প্রদর্শন নয়, বরং অন্যকে মর্যাদা দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করা। প্রকৃত বিনয় কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে পরিণত রূপ। যে ব্যক্তি নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত, তার নিজেকে জাহির করার জন্য বাড়তি কোনো আগ্রাসনের প্রয়োজন হয় না।

উন্নত সমাজগুলোতে এখন সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সম্মানজনক আচরণকেই নেতৃত্বের প্রধান যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়। আমাদের সমাজেও এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। বিনয় হারিয়ে গেলে মানুষ মানুষকে সম্মান করতে ভুলে যাবে। তাই সমাজকে সুস্থ ও মানবিক রাখতে বিনয়কে অবহেলা নয়, বরং ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ