মা যখন ঘাতক: পোস্টপার্টাম সাইকোসিস কি দায়ী?

সম্প্রতি নড়াইলে তিন মাসের এক শিশুকে তার নিজ মায়ের হাতে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সাধারণ দৃষ্টিতে একে ‘নিষ্ঠুরতা’ মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনার নেপথ্যে থাকে ‘পোস্টপার্টাম সাইকোসিস’ (Postpartum Psychosis) নামক এক ভয়ংকর মানসিক ব্যাধি। যেখানে একজন মা বাস্তবতা ও কল্পনার পার্থক্য হারিয়ে ফেলেন এবং নিজের অজান্তেই সন্তানকে শত্রু মনে করে বসেন।
কেন মা হয়ে ওঠেন হন্তারক?
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রসব পরবর্তী সময়ে নারীর শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের আকস্মিক পতন ঘটে। এর সাথে যোগ হয় টানা ঘুমের অভাব, শারীরিক ট্রমা এবং সামাজিক চাপ। এই বহুমুখী চাপে কিছু মায়ের মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এটি কোনো সাধারণ মন খারাপ নয়, বরং একটি ‘মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি’।
মায়ের মানসিক বিপর্যয়ের তিনটি ধাপ
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা প্রসব পরবর্তী মানসিক অবস্থাকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন:
১. বেবি ব্লুজ (Baby Blues): ৭০-৮০ শতাংশ মায়ের ক্ষেত্রে এটি দেখা দেয়। হঠাৎ কান্না বা খিটখিটে মেজাজ হলেও ১-২ সপ্তাহে এটি ঠিক হয়ে যায়।
২. পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন (PPD): এটি বাংলাদেশে প্রায় ২৪-৪৭ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে ঘটে। সন্তান ও নিজের প্রতি এক ধরণের অপরাধবোধ ও অনীহা তৈরি হয়।
৩. পোস্টপার্টাম সাইকোসিস (PPP): এটি বিরল হলেও চরম বিপদজনক। এতে আক্রান্ত মা অদ্ভুত সব শব্দ শোনেন (Hallucination) এবং বিভ্রান্তির (Delusion) শিকার হয়ে নিজের বা শিশুর ক্ষতি করে বসেন।
বিদেশের প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক ট্র্যাজেডি
সন্তান হত্যার এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারাবিশ্বেই পরিচিত। আমেরিকার আন্দ্রেয়া ইয়েটস (৫ সন্তান হত্যা) বা ক্যারল করোরাডো—এদের কেউই ‘খারাপ মা’ ছিলেন না। তারা ছিলেন গভীর মানসিক রোগে আক্রান্ত, যা সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় চরম ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়।
দায় কি কেবলই মায়ের?
“আমার মাথা কাজ করছে না”—মায়ের এই আকুতি যখন পরিবার বা সমাজ ‘স্বাভাবিক’ বলে এড়িয়ে যায়, তখনই বিপদ দানা বাঁধে। চিকিৎসকদের মতে, মা যখন ঘুমের ওষুধের কথা বলেন, তখন পরিবারের উত্তর হয়—“মা ঘুমালে বাচ্চা দেখবে কে?” এই অযত্ন ও একাকীত্বই একজন মাকে মেশিনে রূপান্তরিত করে। স্বামী, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত অবহেলাই এই ধরণের হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ।
সতর্ক সংকেত ও করণীয়
পরিবারের কোনো সদস্য যদি প্রসবের পর অদ্ভুত কথা বলেন, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয় কিংবা সন্তানের প্রতি চরম বিরাগ প্রকাশ করেন, তবে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের স্মরণাপন্ন হতে হবে।
-
মাকে অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
-
নবজাতকের দেখভালের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।
-
মাকে একা ফেলে রাখা যাবে না।
একজন সুস্থ ও সুখী মা-ই পারেন একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। মাকে দোষারোপ নয়, বরং তার মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় এগিয়ে আসাই হোক সময়ের দাবি।
দৈএনকে/জে, আ