গুমের বিচার: আইনের ফাঁক রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

বাংলাদেশে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই ইস্যুকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, গুমের সঙ্গে জড়িত কেউ আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে না। এই অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর বাস্তবায়নই হবে আসল চ্যালেঞ্জ।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা আমাদের রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার জন্য এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে। আইনমন্ত্রী নিজেই উল্লেখ করেছেন, শতাধিক নয়, বরং শত শত মানুষ এই অপরাধের শিকার হয়েছেন। এমনকি উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরাও এর বাইরে নন। ফলে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে।
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গুম প্রতিরোধে প্রণীত অধ্যাদেশ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইনে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ। একদিকে যেখানে আইসিটি আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যমান অধ্যাদেশে তুলনামূলক কম শাস্তির ব্যবস্থা—এই দ্বৈততা আইন প্রয়োগে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। আইনমন্ত্রী যে এই অসামঞ্জস্য দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তবে আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ, স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহিতা। অতীতে বিভিন্ন ঘটনায় বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা ভেঙে না দিতে পারলে নতুন আইনও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও তাদের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ ইতিবাচক। ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেমের মতো ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা আইন প্রণয়নে বাস্তবতা তুলে ধরতে সহায়ক হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, গুমের বিচার শুধু আইনি বিষয় নয়, এটি ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক আস্থার প্রশ্ন। সরকার যে নতুন করে আইন সংস্কার ও সমন্বয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে, তা প্রশংসনীয়। তবে এই উদ্যোগ যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে প্রতিফলিত হয়—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।