দুর্নীতির ‘রাজপুত্র’ বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) ড. মোল্যা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে বহুমুখী দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। অভিযোগ রয়েছে—দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক সত্যতা পেলেও পরবর্তী কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। একই সঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী চক্র তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ধামাচাপা দিতে তৎপর—এমন অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
দুদকের অভিযান ও ১৩ অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা
গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরের নন্দনকানন এলাকায় বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুদক। অভিযানে মোল্যা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে মোট ১৩টি অভিযোগের তদন্ত কার্যক্রমে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুদকের সমন্বিত চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক সাঈদ মুহাম্মদ ইমরান সাংবাদিকদের জানান, বন সংরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর একই দিনে তার স্বাক্ষরে ৭৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারির বদলি হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি বদলির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে।
তবে অভিযানের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও উন্মুক্ত অনুসন্ধান বা দৃশ্যমান অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ পায়নি।
তদন্ত হয়েছে, প্রতিবেদন নেই—১০ মাসেও জমা হয়নি রিপোর্ট
মোল্যা রেজাউল করিমকে স্বপদে বহাল রেখেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব মো. সাইদুর রহমান। গত বছরের ২২ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রামে সরেজমিন তদন্ত করেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে ৭৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারির লিখিত ও মৌখিক বক্তব্য গ্রহণ করা হয়। লিখিত বক্তব্যে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
কিন্তু তদন্ত শেষে প্রায় দশ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন জমা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব পদে দায়িত্ব পালনকারী মো. সাইদুর রহমান বলেন, “অভিযোগের বিষয়গুলো ব্যাপক হওয়ায় জমা দেয়া হয়নি।” কোনো চাপ রয়েছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “বিষয়টি আসলে এমন নয়।”
‘সিন্ডিকেট’ অভিযোগ ও পদোন্নতি বিতর্ক
অভিযোগ উঠেছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মোল্যা রেজাউল করিমকে আড়াল করছে। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হিসেবে অতিরিক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমানের নামও ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন আটকে রেখে পুরস্কারস্বরূপ পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এমনকি পদোন্নতির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সচিব ড. ফারহিনা আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এরশাদ মিয়া জানান, সচিব সভায় ব্যস্ত থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।
‘মোল্যা বাহিনী’ ও দাপটের অভিযোগ
বন অধিদপ্তরে ‘মোল্যা বাহিনী’ নামে একটি প্রভাবশালী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। বদলি, বনায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প ও বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুষের বিনিময়ে পছন্দের পোস্টিং, বদলি বাণিজ্যে নির্ধারিত ‘ক্যাশিয়ার’, অনিয়মের প্রতিবাদ করলে শাস্তিমূলক বদলি, তদন্ত ধামাচাপা দিতে বিশেষ ইউনিট।
এসব বিষয় বন অধিদপ্তর, দুদক ও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে পরিচিত বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনিক প্রভাব
অনুসন্ধান বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মোল্যা রেজাউল করিম চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পান। তার পদায়নে বন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল—এমন দাবি তিনি নিজেই বিভিন্ন মহলে করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ আছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তকমা দিয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্যদিকে ঘনিষ্ঠদের লোভনীয় পদায়ন এবং সমালোচকদের শাস্তিমূলক বদলি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রশ্নের মুখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
দুদকের অভিযানে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরও কেন দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই? দশ মাসেও কেন তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি? অভিযোগ থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা স্বপদে বহাল কেন? এসব প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বন বিভাগ ও প্রশাসনিক অঙ্গনে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে বন বিভাগের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোল্যা রেজাউল করিমকে ফোন করা হলে তিনি মিটিং আছেন বলে ফোন কেটে দেন।