যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইরান

কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র উত্তেজনা, কূটনৈতিক হুঁশিয়ারি ও সামরিক প্রস্তুতির পর অবশেষে ইরানে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের “বড় ধরনের যুদ্ধের অভিযান” শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই অভিযানের লক্ষ্য ইরানে ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর পতন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এর আগে শনিবার ভোরে ইসরায়েল ইরানের রাজধানী তেহরানসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালায়। ইরানের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। ইরান দাবি করেছে, হামলায় বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার জবাবে দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। অন্তত ছয়টি দেশে বিস্ফোরণ ও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। একইভাবে কুয়েতের আল-সালেম বিমানঘাঁটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতেও আঘাত হানার দাবি করেছে ইরান।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। দেশটির সরকার এক বিবৃতিতে এ হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন ও তাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আবুধাবির পর দুবাইয়েও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। রাজধানী মানামার জুফফাইর এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিস্ফোরণের ঘটনা নিশ্চিত করলেও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত জানায়নি। একই সময়ে জর্ডানেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও একাধিক বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হতে দেখা গেছে। তবে বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।
ইসরায়েলকেও সরাসরি লক্ষ্য করে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ইসরায়েলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেলআবিবে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে নাকি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তা প্রতিহত করেছে—সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা জানিয়েছে, ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা লক্ষ্য করে চালানো এই হামলার জবাবে দৃঢ় ও বৈধ পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার তেহরানের রয়েছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সব স্বার্থ এখন ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং পাল্টা হামলায় আগ্রাসীরা অনুতপ্ত হতে বাধ্য হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি থাকায় সংঘাতটি এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।