দক্ষিণী সিনেমার দুই নারী তারকার সংগ্রাম ও খ্যাতির ছায়া

সিল্ক স্মিতা আর শাকিলা—এই দুই নাম শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে আশি–নব্বই দশকের দক্ষিণী সিনেমার কিছু শরীরী দৃশ্য, কিছু দমবন্ধ করা গান, কিছু চুপিসারে দেখা রাত। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়—লক্ষ লক্ষ মানুষের কামনার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা
একজন নারীর দামটা আসলে কত? তামিলনাড়ুর সিল্ক স্মিতা আর কেরালার শাকিলার ক্ষেত্রে সেই দামটা ছিল ভয়ংকর রকমের চড়া। সম্মান, ভালোবাসা, স্বাভাবিক জীবন—সবকিছু। আর সিল্কের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত জীবনটাই।
সিল্ক স্মিতার আসল নাম ছিল বিজয়লক্ষ্মী। তাঁর জীবন শুরুই হয়েছিল অভাব দিয়ে—ক্ষুধা, অচেনা হয়ে থাকা আর অসহায়তার ভেতর দিয়ে। সিনেমা তাঁর কাছে কোনো রোমান্টিক স্বপ্ন ছিল না। বরং একদিন কেউ তাঁর চোখ দেখল, ঠোঁট দেখল, সাহস দেখল—আর ব্যস। একটি চরিত্র, একটি গান, আর হঠাৎ করেই ‘ভাণ্ডিচক্করাম’-এর সেই গান তাঁকে ছুড়ে দিল তামিল সিনেমার মূলস্রোতে। যে জায়গায় তিনি ঢুকেছিলেন পালানোর আশায়, সেখান থেকেই আর বেরোতে পারেননি। হয়তো তাঁর সামনে আদৌ কোনো বাস্তব বিকল্পও ছিল না।

সিল্কের হঠাৎ আত্মহত্যার পর যেন ইন্ডাস্ট্রির শূন্যতা পূরণ করতেই পথ খুলে গেল শাকিলার জন্য। শাকিলার গল্পটাও খুব আলাদা নয়। অভিনয় ভালোবাসতেন তিনি, কিন্তু দারিদ্র্য আর ভাইবোনদের পড়াশোনার দায়িত্ব তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল সফট পর্ন সিনেমার জগতে—তখন তিনি প্রায় কিশোরী। ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছিল, তাঁর শরীরী উপস্থিতিকে পুঁজি করে ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল।
অথচ শাকিলা নিজে কখনো নিজেকে ‘সেক্সি’ ভাবতেই পারেননি। তাঁর কাছে এটা ছিল আর দশটা শ্রমের মতোই একটা কাজ—শুধু পার্থক্য একটাই, এই কাজটার সঙ্গে লেগে ছিল সামাজিক লজ্জা আর ঘৃণার সিলমোহর।

এই দুই নারীর সিদ্ধান্ত, পথচলা—কিছুই আলাদা করে বোঝা যায় না শ্রেণি আর লিঙ্গ রাজনীতিকে বাদ দিয়ে। তাঁদের কাছে সংবেদনশীলতা ছিল মুদ্রা। এমন এক পৃথিবীতে টিকে থাকার হাতিয়ার, যে পৃথিবী তাঁদের কিছুই দিতে রাজি ছিল না। কিন্তু এই মুদ্রাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল ফাঁদ।
খ্যাতির নেশা ভয়ংকর। বিশেষ করে সিল্ক স্বীকার করেছিলেন, হাততালির শব্দ তাঁকে মাতাল করে দিত। যে মানুষটা সারাজীবন অদৃশ্য থেকেছে, তার কাছে হঠাৎ করে দেখা হওয়াটাই ক্ষমতার মতো লাগে—এমনকি যদি সেই দেখা হওয়াটা কামনার বিষয়বস্তু হওয়াটাও তাঁর জন্য বড় দোষের কিছু নয়। কিন্তু, একটা সময় সেই দৃষ্টি চামড়ার ভেতর ঢুকে মনটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়, বিবেককে অসাড় করে দেয়। সিল্ক জানতেন তিনি কী করছেন। জানতেন দর্শক কী চায়। বারবার একই ধরনের চরিত্রে তাঁকে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি চেয়েছিলেন অন্য কিছু হতে—প্রযোজনা করতে চেয়েছিলেন, ভালোবাসতে চেয়েছিলেন, আলাদা পরিচয় বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দর্শক তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। যে কল্পনাকে একসময় তারা উদযাপন করেছিল, সেটার বাইরে সিল্ককে তারা মেনে নিতে পারেনি।
তাহলে কি সিল্ক নিজের সিদ্ধান্তের শিকার ছিলেন? এই বাক্যটা খুব পরিষ্কার, খুব নিরাপদ শোনায়। কিন্তু সত্যিটা এত সহজ নয়। সিল্ক ছিলেন এমন এক নারী, যিনি ইন্ডাস্ট্রি ছাড়তে চাননি, কারণ এই জায়গাটাই তাঁকে দিয়েছিল সেই মনোযোগ, যা সমাজ কোনোদিন দেয়নি। খ্যাতি তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, কিন্তু সংযোগ দেয়নি। যখন সেই খ্যাতি ফুরোল, তখন তিনি একা পড়ে গেলেন—অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়া, মানসিকভাবে ক্লান্ত, আর নিজের তৈরি করা ইমেজের কারাগারে বন্দি। তাঁর আত্মহত্যা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটা একটা সামাজিক ব্যর্থতা।
শাকিলার জীবনেও এই দ্বিচারিতা ছিল। তাঁর নাম হয়ে উঠেছিল অশ্লীলতার প্রতিশব্দ। মুসলিম পরিবার থেকে আসায় ধর্মীয় প্রতিবাদও পিছু ছাড়েনি। অথচ তাঁর সিনেমা ব্যবসা করত দুর্দান্ত। তিনি ছিলেন একাই একটা ইন্ডাস্ট্রি। তবু অন্য অভিনেত্রীদের মতো সম্মান, স্তর, সুযোগ—কিছুই জোটেনি। পুরুষ সহকর্মীদের মতো গুরুত্ব তো নয়ই। সিল্কের মতো ভেঙে না পড়লেও, শাকিলা লড়াই করে কিছুটা জায়গা ফেরত নিয়েছেন। নিজের গল্প নিজে লিখেছেন। কিন্তু সেই ক্ষতগুলো আজও তাঁর সঙ্গে আছে—একজন নারী হয়ে অন্যদের এমন অনুভূতি জাগিয়ে তোলার শাস্তি।
এই পুরো গল্পের কেন্দ্রে আছে পুরুষ দৃষ্টির ভয়ংকর দ্বিমুখিতা। পুরুষরা সিল্ক আর শাকিলাকে ভালোবাসত—কিন্তু অন্ধকারে। দিনের আলোয়, পরিবারের সামনে, সমাজের ভিড়ে—তাদের দিকে তাকাতেও লজ্জা পেত। যে হাতগুলো অন্ধকারে তালি দিত, আলো জ্বালতেই সেই হাতগুলোই ঠেলে দিত একাকিত্বের দিকে। কামনা আর নৈতিকতার এই মানসিক বিভাজন নিয়ে পুরুষরা খুব কমই আত্মসমালোচনা করে। কিন্তু তার শাস্তি ভোগ করে নারীরাই।
আজ আমরা খুব কমই এই নারীদের কথা মর্যাদা দিয়ে বলি। তারা হয়ে যায় গসিপ, কৌতূহল বা বিস্মৃতির অংশ। অথচ প্রশ্নটা থেকেই যায়—নারীর সংবেদনশীলতা এত ভয়ংকর কেন? কেন দরিদ্র নারীরা বাঁচার জন্য নিজের শরীরকে ব্যবহার করলে তারা লজ্জার পাত্র হয়, কিন্তু যে ব্যবস্থা তাদের শোষণ করে, সেটা প্রশ্নের বাইরে থেকে যায়?
সিল্ক স্মিথা আর শাকিলা আসলে আমাদের ভণ্ডামির আয়না। যে ইন্ডাস্ট্রি নারীর শরীরী উপস্থিতি ছাড়া বাঁচতে পারে না, সেই ইন্ডাস্ট্রিই পর্দার আড়ালে সেই নারীদের অপমান করে, ছুড়ে ফেলে দেয়। কী নির্মম বিদ্রূপ। তারা শুধু পর্দার কাজের জন্য নয়, পর্দার পেছনের সহ্য করা যন্ত্রণার জন্যও স্মরণীয় হওয়ার যোগ্য।
হয়তো আজ সবচেয়ে সৎ শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে—তাদের নাম ফিসফিস করে না বলা। লজ্জা ছাড়াই উচ্চারণ করা। আর নারী হিসেবে অন্তত এটুকু করা—নিজের সংবেদনশীলতাকে লুকোনোর জিনিস না ভেবে নিজের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।
এই লেখা বেছে নেওয়ার কারণ ক্লান্তি। নারীদের গল্পকে আরামদায়ক করে ছোট করে ফেলার ক্লান্তি। সিল্ক আর শাকিলা নিখুঁত ছিলেন না। তারা সেটার ভানও করেননি। তারা মানুষ ছিলেন—হেসেছেন, চেয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন। তাদের জীবন আমাদের সামনে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি সত্যিই নারীদের উদযাপন করি, নাকি শুধু তাদের ভোগ করি?
এই সত্যের মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত সিল্ক আর শাকিলা আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে শুধু ছায়া হয়েই থেকে যাবেন।