বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj

গুম খুনের ক্ষত দূর করতে পাশে থাকবে বিএনপি: তারেক রহমান

গুম খুনের ক্ষত দূর করতে পাশে থাকবে বিএনপি: তারেক রহমান
ছবি- সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, কিছু মানুষ বিতর্ক সৃষ্টি করে গণতন্ত্রের পথকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “কৌশলের নামে বিএনপির ওপর কোনো গুপ্ত বা সুপ্ত ষড়যন্ত্র কার্যকর হবে না। কোনো ষড়যন্ত্রেই বিএনপি দমন করা সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, দলীয় ঐক্য ও জনগণের শক্তিকে অটল রেখে বিএনপি দেশের গণতান্ত্রিক স্বার্থে কাজ করে যাবে। রাজনৈতিক চক্রান্তের মুখেও দলের নীতি ও আদর্শ অটুট থাকবে।

শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’ এর যৌথ আয়োজনে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে  মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। 
তারেক রহমান মঞ্চে ডেকে নিয়ে কয়েকটি ভিকটিম পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রিয়জন হারানোর বেদনার কথা জানান স্বজনরা। তাদের কথা শুনে তারেক রহমানও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, বিএনপি গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে থাকবে। 
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে আসা গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের স্বজনরা। তারা বলেন, বাসা-অফিস বা রাস্তা থেকে তাদের প্রিয়জনদের তুলে নেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই জানেন না গুমের শিকার ব্যক্তিদের শেষ  পরিণতি কী হয়েছে। এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও তদন্তের দাবি জানান স্বজনরা।
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় শুধুমাত্র বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেড় লাখের বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যার বোঝা প্রায় ৬০ লাখের মতো নেতাকর্মীকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে। তারপরও বিএনপির নেতাকর্মীরা বছরের পর বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করেছে। কোনো পরিবারের এক ভাই নির্যাতিত হলে, আরেকজন রাজপথে নেমে এসেছে।

তবে এখন কেউ কেউ বিভিন্ন কথা বলে গণতন্ত্রের পথ বাধাগ্রস্ত করতে চায়। বিভিন্ন উসিলায় যারা গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করতে চায়, তাদের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। স্বাধীনতাপ্রিয়, গণতন্ত্রপ্রিয় প্রতিটি মানুষের সামনে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। এবার যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ হাতছাড়া করি, তবে তা শহীদদের প্রতি অবমাননা হবে।
তারেক রহমান বলেন, নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনা বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। ইসি এরই মধ্যে কিছু বিতর্কিত অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে চাই।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বহু বছর দেশ, স্বজন, মানুষ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে আমাকে বাধ্য হয়ে। দূর থেকে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, আমার নেতাকর্মী যারা আছেন, নেতাকর্মীর বাইরেও এই স্বজনহারা মানুষ সারাদেশে যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন, দলীয় অবস্থান থেকে আমরা চেষ্টা করেছি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে সরব উপস্থিতি রাখতে, প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে তুলতে। ঠিক একইভাবে আমরা সেই সময় যতটুকু আমাদের সাধ্য ও সামর্থ্য ছিল তা দিয়ে আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের এই স্বজনহারা মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। আমরা কতটুকু পেরেছি, কতটুকু পারিনি, সেটির জবাব ভিন্ন।
অতীতের সকল অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করতে আগামীতে গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিষ্ঠা জরুরি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এবার যদি আমরা একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকার গঠনের সুযোগ হাতছাড়া করি তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমাদের যে শহীদ, সেই শহীদদের প্রতি জুলুম করা হবে, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি অমর্যাদা করা হবে।

’৭১  সালে যারা শহীদ হয়েছেন এ দেশকে স্বাধীন করার জন্য, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, বিগত ১৬ বছরে যারা গুম-শহীদ হয়েছেন, বিভিন্নভাবে নির্যাতিত-পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, ’২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন যে হাজারো মানুষ, এছাড়া বিভিন্নভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন যারা তাদের সঙ্গে হওয়া প্রত্যেকটি অন্যায়ের বিচারকে যদি প্রতিষ্ঠিত করতে হয় তাহলে আগামীদিনে অবশ্যই বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দরকার।
তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্র কখনোই আপনাদের ভুলে যেতে পারে না। শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে আগামীদিনে বিএনপি কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে এই মুহূর্তে আমি হয়ত বিস্তারিতভাবে সেই পরিকল্পনা আজকের এই অনুষ্ঠানে তুলে ধরতে পারছি না।

কিন্তু তারপর বলতে যদিও কষ্ট হচ্ছে যে আমরা দেখেছি নির্বাচন কমিশনের রিসেন্ট কিছু বিতর্কিত ভূমিকা বা বিতর্কিত অবস্থান। তারপরও একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে চাই। তবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে গণতান্ত্রিক মানুষ যেন এই শহীদদের বা এই গুম হয়ে যাওয়ার সদস্য এখনো যাদের অপেক্ষায় আমরা আছি, এখনো যাদের অপেক্ষায় পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন, সেই শহীদদের আত্মত্যাগ থেকে প্রেরণা লাভ করতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। 
তিনি বলেন, ইনশা-আল্লাহ আমাদের দল বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্র গঠনে, সরকার গঠনে সক্ষম হলে পরে আমরা এই শহীদ পরিবারদের নামে রাষ্ট্রে বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কিংবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পেশা-স্থাপনার নামকরণ করব যাতে যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শহীদদের গৌরবের সঙ্গে স্মরণ রাখতে পারে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর প্রতি সাধ্যমতো রাষ্ট্রীয় সহায়তার হাত বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি।
তারেক রহমান বলেন, আপনারা যারা আজকে আমার সামনে বসে আছেন, এখানে উপস্থিত হয়েছেন শত কষ্ট বুকে নিয়ে, আপনারা যাতে ন্যায়বিচার পেতে পারেন, দেশের আইন অনুযায়ী তার একটি মাত্র উপায় হচ্ছে আগামীদিনে অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করা। যেই সরকার জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণে কাজ করবে, যেই সরকার যারা নির্যাতিত হয়েছেন, অত্যাচারিত হয়েছেন তাদের প্রতি ন্যায় বিচার করবে।

আসুন, আমরা আজ সেই শপথ গ্রহণ করি, আমরা আজ সেই প্রত্যাশা করি। আপনাদের আজ এখানে আসা, এখানে উপস্থিত হওয়া যাতে বৃথা না যায়। আপনাদের প্রতি যে অন্যায় হয়েছে সেই অন্যায়ের বিচার যাতে হতে পারে আপনারা যাতে ন্যায়ের ন্যায্যতা পেতে পারেন সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করি। আসুন আমরা ধৈর্য ধারণ করি, আমরা সজাগ থাকি যাতে আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রা যা শুরু হয়েছে তাতে যাতে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে।
তারেক রহমান বলেন, গুম-খুন-অপরণের শিকার পরিবারগুলোর আশা ও ভাষা হয়ে কাজ করে যাচ্ছে একটি সংগঠন ‘মায়ের ডাক’। ফ্যাসিবাদের শিকার মানুষদের প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছে মায়ের ডাকে সানজিদা ইসলাম তুলি। আর দল হিসেবে সাধ্য এবং সামর্থ্যরে সবটুকু নিয়ে নির্যাতিত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে আমরা ‘বিএনপি পরিবার’।
তারেক রহমান বলেন, দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা কখনো কখনো হয়তো কিছুটা স্তিমিত হয়েছে, আন্দোলন কখনো তুঙ্গে উঠেছে এবং এই আন্দোলন করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য মানুষ গুম-খুন, অপরহণ-মিথ্যা মামলায় হয়রানি-নির্যাতনের পর বিএনপির একজন নেতাকর্মীও কিন্তু রাজপথ ছাড়েনি।  একই পরিবারের এক ভাই গুম হয়েছে আরেক ভাই গিয়ে তার জায়গায় পরেরদিন রাজপথে আন্দোলনকে আরও তীব্রতর করার প্রতিজ্ঞার শপথ নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, কৌশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্তবেশ ধারণ করেনি বিএনপির কর্মীরা। আমি বিশ্বাস করি, যে দলের নেতাকর্মীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের আপসহীন ভূমিকা রাখতে পারে সেই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে কেউ এই দলকে দমন করে রাখতে পারবে না ইনশা আল্লাহ। আপসহীন ভূমিকার কারণে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে এই দলকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। 
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে নির্যাতনের শিকার আমার সামনে বসা হাজারো প্রিয় মুখ, আপনাদের বুকে আত্মত্যাগ, আপনাদের বুক ভরা কষ্ট আমরা বুঝতে পারি। আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করব যাতে এই ত্যাগ যেন বৃথা না যায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকারের অবশ্যই অনেক অনেক দায় এবং দায়িত্ব রয়েছে।
আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের সভাপতিত্বে এবং মায়ের ডাকের সভানেত্রী সানজিদা ইসলাম তুলি, আমারা বিএনপি পরিবারের সদস্য জাহিদুল ইসলাম রনি ও মোকসেদুল মোমিন মিথুনের যৌথ সঞ্চালনায় এই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন গুম থেকে ফিরে আসা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, আমরা বিএনপি পরিবারের প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, উপদেষ্টা রশিদুজ্জামান মিল্লাত, গুম হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনা প্রমুখ। অনুষ্ঠানে প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একটি দল নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ খুঁজছে। ওই দলটি বিভিন্ন কৌশলে নির্বাচন থেকে সরে যেতে চায়, আমরা সেই সুযোগ দেব না। নির্বাচন কমিশনকে বলবো সমতা আনতে হবে। বিএনপির ভদ্রতা দুর্বলতা নয়। যারা ষড়যন্ত্র করে গণতন্ত্র উত্তরণের পথ বাধাগ্রস্ত করতে চায় তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না। 
তারেক রহমানের উত্তরবঙ্গ সফর প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন বলেন, নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে শান্তির জন্য আমরা কর্মসূচি স্থগিত করেছি। নির্বাচন কমিশন এবং একটি রাজনৈতিক দল মনে করেছে এটা আমাদের দুর্বলতা, এটা আমাদের ভদ্রতা।  


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন