সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • তফসিল নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ ইসির ৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক, উদ্বেগ জানাল ইএসডিও ‘স্বৈরাচার হেরেছে’ স্লোগানে মুখর দিল্লি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে উচ্ছ্বাস রোববার জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নতুন পে-স্কেল চূড়ান্তের পথে, আগস্টেই গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ওপর জোর দিলেন তথ্যমন্ত্রী দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি, একদিনে প্রাণ গেল একজনের ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ভিসা সমস্যা সমাধানের আহ্বান শাপলা চত্বর মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল ২৭ জুলাই হাম-উপসর্গে বাড়ছে মৃত্যু, সর্বশেষ ৬ শিশুর সবাই ঢাকা বিভাগের
  • স্ট্যানলি: পৃথিবীর প্রান্তে এক শান্ত আশ্রয়

    স্ট্যানলি: পৃথিবীর প্রান্তে এক শান্ত আশ্রয়
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    পৃথিবীর এক প্রান্তে, নিঃশব্দ সৌন্দর্যের শহর স্ট্যানলি। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী এই শহর যেন নীরব এক আশ্রয়স্থল, যেখানে সমুদ্রের নোনা বাতাস, পাহাড়ের স্থিরতা এবং প্রকৃতির নির্ভেজাল সুর মিলেমিশে এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেছে। তিন দিনের সমুদ্রযাত্রার পর দূর থেকে স্ট্যানলির অবয়ব চোখে পড়লে মনে হয়, নীল সমুদ্রের ওপর কেউ সাদা তুলোর মতো এক শহর আঁকেছে—নরম, নির্লিপ্ত, কিন্তু জীবন্ত।

    জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে শহরটি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট্ট এক আশ্রয় হিসেবে দেখা যায়। জনসংখ্যা মাত্র দুই হাজার হলেও, এটি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রাণকেন্দ্র, সভ্যতার ক্ষুদ্র কিন্তু গর্বিত প্রতীক। বন্দরের দিকে ধীরে ধীরে এগোলে মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে দূরে এক শান্তির আশ্রয়ে প্রবেশ করেছি।

    শহরের রাস্তায় সারি সারি রঙিন কাঠের ঘর, ইংল্যান্ডের লাল টেলিফোন বুথ—যা লন্ডনে দেখা যায়—সেখানে দাঁড়িয়ে যেন ব্রিটিশ ইতিহাসের ছোঁয়া এনে দিয়েছে। প্রতিটি জানালার কাঁচে আলো ঝলমল করে, কিন্তু শব্দ নেই; মনে হয়, এখানে মানুষের নয়, নীরবতারই রাজত্ব।

    আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল পৃথিবীর সর্বদক্ষিণের শহর উশুইয়া থেকে। তিন দিনের সমুদ্রযাত্রায় ঢেউ, কুয়াশা, নোনা জল এবং অসীম নীরবতা অভিজ্ঞতাকে এক রূপকথার মতো বানিয়ে দেয়। কখনও প্রবল ঝড় আসে, যাত্রীরা অসুস্থ হয়, তখন বোঝা যায়, ভ্রমণ শুধু আনন্দ নয়, ধৈর্যের পরীক্ষা ও অভিযানের শিক্ষা।

    স্ট্যানলিতে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে মনে হয়, আমরা সত্যিই পৃথিবীর প্রান্তে পৌঁছেছি। আকাশ অন্যরকম নীল, বাতাসে অন্য সুর। প্রকৃতি নির্মম হলেও উদার। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ মূলত দুটি বড় দ্বীপ—পূর্ব ও পশ্চিম ফকল্যান্ড—আর চারপাশে ছড়িয়ে আছে শত শত ছোট দ্বীপ। রাজনৈতিকভাবে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে হলেও আর্জেন্টিনা এখনো মালভিনাসের দাবি জানায়।

    ফকল্যান্ডের ইতিহাস রক্তাক্ত ও জটিল। ১৬৯০ সালে প্রথম ইংরেজ নাবিক পা রাখেন, পরে ফরাসি, স্প্যানিশ ও ব্রিটিশের মধ্যে দ্বীপটি হাতবদল হয়। ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশরা স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়, স্থানীয়রা প্রতি বছর মুক্তি দিবস উদযাপন করে।

    প্রকৃতির দিক থেকে ফকল্যান্ড এক অনন্য বিস্ময়। এখানে মানুষের চেয়ে বেশি বন্যপ্রাণী; পেঙ্গুইন, সিল, তিমি, ডলফিন, অগণিত পাখি স্বাধীনভাবে বাঁচে। বিশেষ করে পাঁচ প্রজাতির পেঙ্গুইন একসাথে দেখা যায়, যা পৃথিবীর খুব কম জায়গায় সম্ভব। পেঙ্গুইনরা রাজকীয়ভাবে হাঁটে, দলবদ্ধভাবে দৌড়ায়, পাহাড়ে উঠে—প্রকৃতির এক মহোৎসব।

    ফকল্যান্ডের ভূপ্রকৃতি পাথুরে ও ঢেউ খেলানো; পাহাড়ের মাঝে ঘাসে ঢাকা প্রান্তর, দূরে মাউন্ট আসবোর্ন (৭০৫ মিটার)। বাতাস পশ্চিম থেকে আসে, সঙ্গে নিয়ে শান্তি এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য। জীবনধারা সরল, আত্মনির্ভর, পরিশ্রমী। রাজধানী স্ট্যানলির বাইরের এলাকায় ‘ক্যাম্প’ নামে খামারগুলো প্রাকৃতিক জীবনধারার প্রতীক।

    রাত নামলে স্ট্যানলির রূপ বদলে যায়। ঘন কুয়াশা, সমুদ্রের গভীর শব্দ, দূরের পাহাড়ে ঝলমল তুষাররেখা। শহরের আলো নিভে আসে, শুধুমাত্র লাল টেলিফোন বুথ জ্বলজ্বল করে। বোঝা যায়, স্ট্যানলি কেবল শহর নয়, অনুভূতি, নিঃশব্দ কবিতা—যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি একে অপরকে ভালোবেসে বাঁচে।

    ফকল্যান্ড শেখায় এক অদ্ভুত পাঠ: পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল একসময় মিলিয়ে যায়, কিন্তু প্রকৃতি, নীরবতা এবং সরলতার সৌন্দর্য চিরস্থায়ী। পৃথিবীর প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই ছোট্ট শহর যেন ফিসফিস করে বলে—সৌন্দর্য সব সময় চোখে দেখা যায় না, কখনও কখনও তা কেবল অনুভব করা যায়।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ