মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj
ক্ষমতার শীর্ষে নারী

দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব, দ্বন্দ্ব ও পতনের ইতিহাস

দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব, দ্বন্দ্ব ও পতনের ইতিহাস
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

বিশ্ব ইতিহাসে নারী রাষ্ট্রনেত্রীর সংখ্যা শতকের ঘর ছুঁলেও, দক্ষিণ এশিয়া এই প্রশ্নে এক ব্যতিক্রমী অঞ্চল। সামাজিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক বলে পরিচিত এই ভূখণ্ডেই স্বাধীনতার পর বারবার উঠে এসেছেন নারী রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। পারিবারিক উত্তরাধিকার, রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি, গণআন্দোলন কিংবা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধ সংগ্রাম—ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে তারা পৌঁছেছেন ক্ষমতার শীর্ষে। আবার সেই ক্ষমতাই অনেকের জীবনে বয়ে এনেছে বিতর্ক, সহিংসতা ও করুণ পতন।

দক্ষিণ এশিয়ার নারী নেতৃত্বের ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় আরও পুরোনো অতীতে। প্রাচীন সুমেরের রানী কুবাবা কিংবা মিশরের শেষ ফারাও ক্লিওপেট্রা ছিলেন পুরুষশাসিত সমাজে ব্যতিক্রমী ক্ষমতার প্রতীক। কুবাবা সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে রাষ্ট্র পরিচালনার নজির গড়েছিলেন। আর ক্লিওপেট্রা কূটনীতি, বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক জোটের মাধ্যমে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন এক ট্র্যাজিক শাসক হিসেবে।

আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম ইন্দিরা গান্ধী। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় এসে দৃঢ় সিদ্ধান্ত, শক্ত হাতে শাসন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আত্মবিশ্বাসী অবস্থানের মাধ্যমে ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিত হন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা তাকে বৈশ্বিক রাজনীতির উচ্চতায় নিয়ে যায়। তবে জরুরি অবস্থা জারি, নাগরিক অধিকার হরণ ও স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযান তার নেতৃত্বকে করে তোলে গভীরভাবে বিতর্কিত। শেষ পর্যন্ত নিজের দেহরক্ষীর হাতে নিহত হয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটে—যা ক্ষমতার নিষ্ঠুর বাস্তবতাকেই সামনে আনে।

পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের আরেকটি শক্তিশালী কিন্তু করুণ অধ্যায়। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, নির্বাসন ও কারাবাস পেরিয়ে তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিক নারী প্রধানমন্ত্রী হন। গণতন্ত্রের প্রতীক হলেও তার শাসনকাল দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত ছিল। ২০০৭ সালে জনসভায় নিহত হয়ে বেনজির প্রমাণ করে যান—এই অঞ্চলে ক্ষমতার রাজনীতি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

শ্রীলঙ্কার চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা নেতৃত্ব দিয়েছেন দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ছায়ায়। আত্মঘাতী হামলায় আহত হয়েও তিনি ক্ষমতায় থেকেছেন, শান্তি আলোচনার চেষ্টা করেছেন। তবে জাতিগত সংঘাতের জটিল সমাধান তার পক্ষেও সম্ভব হয়নি। তবু নারীর দৃঢ়তা ও সহনশীল নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে তার অবস্থান আলাদা।

বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও দ্বিমুখী। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া—দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী প্রায় তিন দশক ধরে দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। খালেদা জিয়া সামরিক শাসন-পরবর্তী গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আবার তার শাসনকাল দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে সমালোচিত। কারাবাস ও রাজনীতি থেকে দীর্ঘ অনুপস্থিতি তার জীবনে নাটকীয় মোড় আনে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত রূপান্তরের দাবি করলেও মানবাধিকার, বিরোধী রাজনীতি দমন ও গণতন্ত্র সংকোচনের অভিযোগে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার শাসনের পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করে।

এই সব নারী শাসকের উত্থান-পতন একদিকে যেমন নারীর ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। পারিবারিক রাজনীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সামরিক হস্তক্ষেপ ও সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নেতৃত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

তবু এই নেত্রীরা প্রমাণ করেছেন—রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু পুরুষের একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়। তাদের উপস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের কল্পনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। ক্ষমতার শীর্ষে উঠে তারা দেখিয়েছেন, নেতৃত্ব লিঙ্গনির্ভর নয়; বরং রাজনৈতিক কাঠামোই নির্ধারণ করে নেতৃত্বের সাফল্য ও স্থায়িত্ব।

ইন্দিরা থেকে খালেদা—এই পথচলা তাই কেবল কয়েকজন নারীর গল্প নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, ক্ষমতা ও সমাজের গভীর দ্বন্দ্বেরই প্রতিচ্ছবি।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ