অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন বৈধ, আপিল বিভাগ রায় বহাল রাখল

সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল রেফারেন্সের (Special Reference) আলোকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ গ্রহণ ও গঠন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
আজ (৪ ডিসেম্বর, ২০২৫) আপিল বিভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন। এর ফলে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আইনগত ভিত্তি আরও মজবুত হলো।
এর আগে হাইকোর্ট এক রায়ে উল্লেখ করেছিলেন যে, দেশে উদ্ভূত সাংবিধানিক শূন্যতা এবং জরুরি পরিস্থিতির কারণে প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে গঠিত এই অন্তর্বর্তী সরকার বৈধ এবং সংবিধানসম্মত। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই সিদ্ধান্তকে বহাল রাখলেন।
এই রায়ের ফলে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সব ধরনের আইনগত বাধা দূর হয়ে গেল।
অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা লিভ টু আপিল খারিজ করে এই সিদ্ধান্ত দেন সর্বোচ্চ আদালত।
আপিল বিভাগের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক। রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মহসীন রশিদ।
ইন্টারভেনর হিসেবে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির।
আপিল বিভাগ আদেশে বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ ও গঠন প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট খারিজে হাইকোর্টের আদেশ যথার্থ। এ কারণে আপিল বিভাগ ওই আদেশ বহাল রাখছেন। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের ৭ জন বিচারপতি সর্বসম্মতিক্রমে এই আদেশ প্রদান করেন।
আদেশের পর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আপিল বিভাগের এই রায়ের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন, শপথ ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলার আর কোনো আইনগত সুযোগ রইল না। এখন সরকারের বৈধতা নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তা সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হলো।
এর আগে গত ২ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ ও গঠনকে বৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা লিভ টু আপিলের শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে আইনজীবীরা বলেন, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় বৈধতা। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবেই এই সরকার গঠিত হয়েছে।
৩ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ এই মামলার আদেশ ঘোষণার জন্য ৪ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন।
এর আগে গত ১২ নভেম্বর এই মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ মহসিন রশিদ অংশ নেন। শুনানিকালে আদালত সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করায় তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন অ্যাটর্নি জেনারেল। পরে আপিল বিভাগ এ বিষয়ে তার কাছে ব্যাখ্যা তলব করেন।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চাওয়া হয়। ওই দিন তৎকালীন প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের ৭ জন বিচারপতি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পক্ষে স্পেশাল রেফারেন্স প্রদান করেন।
স্পেশাল রেফারেন্সে বলা হয়, দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮ (৩) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। এই সাংবিধানিক বাস্তবতার ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মতামত দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্টের এই মতামত ও বৈধতা পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পাঠ করান।
পরে ওই স্পেশাল রেফারেন্সের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। গত ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্ট সেই রিট খারিজ করে রায় দেন। রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির রেফারেন্সের পর সুপ্রিম কোর্টের মতামতের ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে।
হাইকোর্ট আরও উল্লেখ করেন, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইন মেনেই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে গঠিত হয়েছে।
এই রায়ের বিরুদ্ধে পরে রিটকারী আইনজীবী লিভ টু আপিল দায়ের করেন, যা এখন আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে খারিজ করলেন।