দক্ষিণ এশিয়ার অস্থিরতা: নেপালে সহিংসতা, মোদির নতুন চ্যালেঞ্জ

নির্ধারিত ভারত সফরের ঠিক এক সপ্তাহ আগে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ এবং সহিংস সংঘর্ষের মুখে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এই পরিস্থিতি শুধু নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিফলন নয়, এটি ভারতের জন্যও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, কারণ নেপাল ভারতের একটি কৌশলগত প্রতিবেশী দেশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালের এ অস্থিরতা নয়াদিল্লির কৌশলগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। এটি ভারতের মনে করিয়ে দিচ্ছে সম্প্রতি বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময় ভারতের কঠিন অবস্থানকে। বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার এই অস্থির প্রেক্ষাপটে ভারতের কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিষয়ক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
নেপালের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সকল পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং শান্তিপূর্ণ সংলাপে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। ভারতের কূটনীতিকদের মতে, নেপালের পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
নির্ধারিত ভারত সফরের এক সপ্তাহ আগে সহিংস বিক্ষোভের মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগে বাধ্য হন। নেপালের এই অস্থিরতা ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, কারণ দেশটি ভারতের কৌশলগত প্রতিবেশী। সেই সঙ্গে এটি ভারতকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনে নয়াদিল্লির কঠিনতম অবস্থান।
বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) সংবাদমাধ্যম বিবিসির বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার পতনের ঘটনা এটি তৃতীয়বার, যেখানে ভারতের ঘনিষ্ট প্রতিবেশী দেশটির অস্থিরতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে এবং দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবনে হামলা চালায় এবং কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছেন। কাঠমান্ডুর এই অস্থির দৃশ্য বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অভ্যুত্থানের সঙ্গে মিল রেখেছে।
ভারতের নেপাল নিয়ে বিশেষ উদ্বেগের কারণ হলো এই দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব। নেপালের সীমান্ত ভারতের উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, সিকিম, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে প্রায় ১,৭৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এর সঙ্গে, নেপালে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের উপস্থিতি এবং ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমির প্রবেশপথও ভারতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে প্রায় ৩৫ লাখ নেপালি বসবাস করেন এবং তাদের সঙ্গে গভীর পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। নেপালে প্রায় ৩২ হাজার গুর্খা সেনা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত। তাছাড়া, নেপালের হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য ভারতীয় ভক্তদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিবছর হাজারো হিন্দু তীর্থযাত্রী নেপালের মন্দিরগুলোতে যান।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই অস্থিরতাকে 'হৃদয়বিদারক’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং নেপালের স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভারত যেমন হতবাক হয়েছিল, ঠিক তেমনি নেপালের এই সংকটও তাদের জন্য অপ্রত্যাশিত। বিশেষ করে ওলির পদত্যাগ এবং নয়াদিল্লিতে তার সফরের এক সপ্তাহ আগে এই ঘটনা ঘটায় এটি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
ভারত এবং চীন দু’দেশেই নেপালে প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে এবং নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এখন সতর্ক কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করা জরুরি, যাতে পরিস্থিতি আরও জটিল না হয়। তারা নেপালে বাংলাদেশের মতো সংকট চাইছে না।
২০১৯ সালে ভারতের বিতর্কিত মানচিত্র প্রকাশের পর নেপাল ক্ষুব্ধ হয়েছিল এবং পাল্টা মানচিত্র প্রকাশ করেছিল। এই কূটনৈতিক অস্থিরতা চীন ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য পুনরায় শুরু হলেও, ভারত ও নেপালের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি এক নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ভারতের উচিত নতুন নেপালি নেতৃত্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বিক্ষুব্ধ এবং আন্দোলনরত তরুণদের পক্ষ নেয়া। ভারতকে তাদের প্রতিবেশী দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর কূটনীতি প্রয়োগ করতে হবে।
ভারতীয় বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অশোক মেহতা বলেন, ‘ভারত তার বৃহৎ শক্তি হওয়ার স্বপ্নে মগ্ন, তবে সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে প্রতিবেশী অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।’