ইসলামের প্রথম যুগের মক্কা: নির্যাতন ও ধৈর্যের গল্প

ইতিহাসের পাতায় এমন বহু অধ্যায় আছে , যা শুধু ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে অমোঘ ছাপ ফেলে। ইসলামের প্রথম যুগের মক্কা ছিল এমনই এক রক্তঝরা অধ্যায়। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহিদ) ঘোষণা করলেন। এরপরই কুরাইশদের অমানবিক নির্যাতন, ভয়ঙ্কর নিপীড়ন এবং অকল্পনীয় সহিংসতা শুরু হয়। কিন্তু সেই কঠোর দিনে ইসলামের প্রথম অনুসারীরা অটল ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যা মানব ইতিহাসে বিরল।
কুরাইশদের শত্রুতা ও নির্যাতনের সূচনা
যখন রসুলুল্লাহ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) ঘোষণা করলেন, তখন কুরাইশদের গর্ব, অহংকার, মূর্তিপূজার অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষমতা ভেঙে পড়তে শুরু করল। তারা দেখল, যদি ইসলামের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের মূর্তিপূজাভিত্তিক বাণিজ্য, প্রভাব ও সম্মান ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন তারা ইসলামের অনুসারীদের ওপর ভয়ঙ্কর নিপীড়ন শুরু করল।
কুরআনে আল্লাহ বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ ٱلْخَوْفِ وَٱلْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ ٱلْأَمْوٰلِ وَٱلْأَنفُسِ وَٱلثَّمَرٰتِ ۗ وَبَشِّرِ ٱلصّٰبِرِينَ আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে; আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। (সুরা বাকারা:১৫৫)
যেসব সাহাবারা নির্যাতিত হয়েছেন
১. বিলাল ইবনু রাবাহ রা. নির্যাতনের মরুভূমির আগুনে ঈমানের বিজয়
ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হজরত বিলাল রা. ছিলেন একজন ইথিওপীয় দাস। উমাইয়া ইবনু খালাফ তাকে প্রচণ্ড উত্তপ্ত মরুভূমিতে পিঠের ওপর পাথর চাপিয়ে রাখত। রোদে দগ্ধ শরীরে চাবুকের আঘাত করতো, তবু তাঁর জিহ্বা থেকে একটাই শব্দ বের হতো, أَحَدٌ أَحَدٌএক আল্লাহ, এক আল্লাহ । (সহিহ বুখারি:৩৮৫৬)
২.আম্মার ইবনু ইয়াসির রা.ও তাঁর পরিবার শহিদের ইতিহাস
ইয়াসির রা.ও তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া রা. ইসলামের প্রথম দিকের সাহাবি। কুরাইশরা তাদের মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে টেনে নিয়ে যেত, খুঁটির সাথে বেঁধে রাখত, শরীরে গরম লোহা চেপে ধরত।
৩.সর্বপ্রথম সুমাইয়া রা.-কে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তিনি ইসলামের প্রথম শহিদা।
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন,
- صَبْرًا آلَ يَاسِرٍ، فَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْجَنَّةُ হে ইয়াসির পরিবার! ধৈর্য ধরো। তোমাদের জন্য জান্নাতের অঙ্গীকার রয়েছে। (মুসনাদু আহমাদ:৩৫৭৫)
৪. খাব্বাব ইবনুল আরাত রা.অগ্নিশিখার ওপর ধৈর্য
তিনি ইসলাম গ্রহণ করার কারণে এমনভাবে নির্যাতিত হতেন যে, তার পিঠে গরম কয়লা রাখা হতো। কয়লার উত্তাপে চামড়া গলে যেত, কিন্তু ঈমান থেকে তিনি এক চুলও সরতেন না। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন তাঁর যন্ত্রণা দেখে বললেন, ধৈর্য ধরো, হে খবাব! একদিন আসবে, যখন আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং তোমরা শান্তিতে থাকবে। (সহিহ বুখারি: ৩৬১২)
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর কুরাইশদের নির্যাতন
শুধু সাহাবিরাই নয়, স্বয়ং রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও নানাভাবে নির্যাতিত হতেন। একবার কুরাইশদের একদল উট জবাই করার পর তার নোংরা নাড়িভুঁড়ি ও রক্ত মিশিয়ে নবীজির সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা ও পিঠে ছুড়ে মারে যখন তিনি সিজদায় ছিলেন। (সহিহ বুখারি:২৪০)
মুসলমানদের ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতিশ্রুতি
এতসব নির্যাতন, ক্ষুধা, সামাজিক বয়কট ও প্রাণঘাতী আক্রমণের মধ্যেও প্রাথমিক মুসলমানরা ধৈর্যের অসীম উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। তাদের হৃদয়ে ছিল এই বিশ্বাস إِنَّ مَعَ ٱلْعُسْرِ يُسْرًا নিশ্চয়ই, কষ্টের সাথে রয়েছে সহজি। (সুরা আলাম নাশরা:৬) অবশেষে আল্লাহ তাদের বিজয় দান করেন। বদর, উহুদ, খন্দক প্রতিটি যুদ্ধে তাদের ধৈর্যের ফসল ফুটে ওঠে।
মক্কার সেই রক্তঝরা দিনগুলো শুধু ইতিহাস নয়; এটি ধৈর্য, ত্যাগ, এবং আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আস্থার এক মহিমান্বিত দৃষ্টান্ত। কুরাইশদের নির্মম নির্যাতনের মুখেও ইসলামের প্রথম অনুসারীরা পিছপা হননি। তাদের ধৈর্য, ত্যাগ ও ঈমানের শক্তিই আজকের বিশ্বে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।
দৈএনকে/ জে. আ