যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ৩৪ মুসলিম প্রার্থীর জয়, ইতিহাস গড়লেন আল-সাইয়েদ

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন মুসলিম প্রার্থীরা। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অন্তত ৩৪ জন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। ভোট গণনায় এগিয়ে রয়েছেন আরও তিনজন। কংগ্রেস, অঙ্গরাজ্যের আইনসভা, বিচার বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পদে তাঁদের এই সাফল্য মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরেছে।
নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, জয়ী ও এগিয়ে থাকা ৩৭ প্রার্থীর মধ্যে আটজন কংগ্রেসের বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাঁদের একজন সিনেটে এবং সাতজন প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় ২৭ জন এবং বিচার বিভাগ ও কাউন্টি পর্যায়ের দুটি পদে মুসলিম প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন কিংবা ভোট গণনায় এগিয়ে রয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য এসেছে মিশিগান থেকে। অঙ্গরাজ্যটির সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
৪২ বছর বয়সী আল-সাইয়েদ পেশায় চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। এর আগে তিনি মিশিগানের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসার ব্যয় কমানো, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং ইসরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি।
প্রচারণার সময় ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েন আল-সাইয়েদ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা তাঁর সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আল-সাইয়েদও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। ডেমোক্র্যাটরা এ ধরনের বক্তব্যকে ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচারণা বলে সমালোচনা করেন। বিতর্কের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত জয় পান তিনি।
প্রতিনিধি পরিষদেও মুসলিম প্রার্থীদের জয়
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনেও একাধিক মুসলিম প্রার্থী জয় পেয়েছেন। মিনেসোটা থেকে ইলহান ওমর, মিশিগান থেকে রাশিদা তালিব, ইন্ডিয়ানা থেকে আন্দ্রে কারসন এবং ক্যালিফোর্নিয়া থেকে লতিফা সিমন পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন আদম হামাওয়ি। এর মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য হতে যাচ্ছেন তিনি। পেশায় চিকিৎসক হামাওয়ি মার্কিন সেনাবাহিনীতেও চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
নির্বাচনী প্রচারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালু, চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণের বোঝা কমানো এবং ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেন হামাওয়ি।
নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে দীর্ঘদিনের কংগ্রেস সদস্য আদ্রিয়ানো এসপাইয়াতকে হারিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। এবারের নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম লাতিনা মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন শেভালিয়ের।
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পূর্ণ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন আয়েশা ওয়াহাব। এর আগে গত আগস্টে অনুষ্ঠিত বিশেষ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হন তিনি।
অঙ্গরাজ্যের আইনসভায়ও সাফল্য
কংগ্রেসের বাইরে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভা নির্বাচনেও মুসলিম প্রার্থীদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। মিশিগানে আব্বাস আলাউয়েহ, আলাবাস ফারহাত ও জালাল আবদুল্লাহ নিজ নিজ নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছেন অথবা ভোট গণনায় এগিয়ে ছিলেন।
প্রতিবেশী ওহাইওতে নির্বাচিত হয়েছেন মুনিরা আবদুল্লাহি ও ইসমাইল মোহাম্মদ। ইলিনয়ে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা একটি আসন ডেমোক্র্যাটদের ফিরিয়ে দিয়েছেন নাবিলা সৈয়দ। অঙ্গরাজ্যটির ২৬তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী ডার্বি হিলসকে হারিয়েছেন তিনি। একই অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদে নিজের আসন ধরে রেখেছেন আবদেলনাসের রশিদ।
মিশিগানের আপিল আদালতের নির্বাচনে ভোট গণনার সময় এগিয়ে ছিলেন মুসলিম প্রার্থী মারিয়াম সাদ বাজ্জি।
মিনেসোটায় অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা ওমর ফাতেহ ও জয়নাব মোহাম্মদ জয় পেয়েছেন। এ ছাড়া মোহামুদ নুর ও সামাকাব হুসেইন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ওরেগনে নিজের আসন ধরে রেখেছেন মুসলিম স্টেট সিনেটর কায়সে জামা। তিনিও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে ওরেগনের ওয়াশিংটন কাউন্টির চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে নাফিসা ফাই প্রতিদ্বন্দ্বী পাম ট্রিসের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ৪৮তম ডিস্ট্রিক্টে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন ওসমান সালাহউদ্দিন।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও মুসলিম প্রার্থীদের জয়
নিউইয়র্কের ১২তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন আবের কাওয়াস। একই অঙ্গরাজ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন রবার্ট জ্যাকসন।
কানেকটিকাটের স্টেট সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন মরিয়ম খান ও সৌদ আনোয়ার। ডেলাওয়ারে মদিনা উইলসন-অ্যান্টন এবং পেনসিলভানিয়ায় তারিক খান নিজেদের আইনসভার আসনে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তবে কানেকটিকাটের চতুর্থ স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা এমডি রহমানের ফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি।
জর্জিয়া, টেক্সাসসহ দক্ষিণাঞ্চলেও সাফল্য
দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতেও মুসলিম প্রার্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। জর্জিয়ার সপ্তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয় পেয়েছেন রুয়া রোমান। একই অঙ্গরাজ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন শেখ রহমান। রিপাবলিকানদের দখলে চলে যাওয়া নিজের পুরোনো আসন পুনরুদ্ধার করেছেন ফারুক মুগল।
টেক্সাসে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন সালমান ভোজানি ও সুলেমান লালানি। অঙ্গরাজ্যটির হ্যারিস কাউন্টির বিচারক পদে জয় পেয়েছেন লেটিশিয়া প্লামার। এর মধ্য দিয়ে টেক্সাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্বাচিত মুসলিম নারী জনপ্রতিনিধি হিসেবে নতুন পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।
নর্থ ক্যারোলাইনায় স্টেট সিনেটর মুজতবা মোহাম্মদ নিজের আসন ধরে রেখেছেন। কলোরাডোর ২৯তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ইমান জোদেহ। আর টেনেসিতে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ইউসুফ হাকিম।
কয়েকটি আসনে পরাজয়, কিছু ফল অনিশ্চিত
এবারের নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের বড় সাফল্য এলেও সবাই জয়ী হতে পারেননি। অ্যারিজোনার চতুর্থ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী জুহদি জাসের পরাজিত হয়েছেন। ফ্লোরিডার ১০৩তম হাউস ডিস্ট্রিক্টে হেরেছেন ইমতিয়াজ মোহাম্মদ।
মিনেসোটার হেনেপিন কাউন্টি কমিশনার নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থী শ্যারন এল-আমিন বর্তমান কমিশনার আইরিন ফার্নান্দোর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। এ ছাড়া কয়েকটি আসনে ভোট গণনা চলায় প্রার্থীদের চূড়ান্ত অবস্থান তখনো নিশ্চিত হয়নি।
১৬০ জনের বেশি মুসলিম প্রার্থীর অংশগ্রহণ
মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ বাড়ার চিত্র এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও দেখা গেছে। মুসলিম নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (সিএআইআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে ১৬০ জনের বেশি মুসলিম প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে এ সংখ্যা ছিল ১৪৫।
এবারের নির্বাচনী প্রচারে নাগরিক অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, মানবিক সহায়তা এবং ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তনের দাবি কয়েকজন মুসলিম প্রার্থীর প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্য মার্কিন রাজনীতিতে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব ও সক্রিয়তা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে আবদুল আল-সাইয়েদের সিনেট নির্বাচনে জয় দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। তবে কয়েকটি আসনে ভোট গণনা ও আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা বাকি থাকায় মুসলিম প্রার্থীদের মোট জয় ও এগিয়ে থাকার সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।