লোগো ও নথিতে বদল এলেও পোশাকে পুরোনো মনোগ্রাম: এসআরবিকে ঘিরে আস্থার সংকট

নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা ও কাঠামোগত সংস্কারের ধারাবাহিকতায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে এলিট ফোর্স ‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন’ (র্যাব)। এর পরিবর্তে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিআয়াট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি)। দাপ্তরিক কাগজপত্র, অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নতুন পরিচয়ের ছোঁয়া লাগলেও মাঠপর্যায়ে এখনো র্যাবের পুরোনো পোশাকেই দায়িত্ব পালন করছেন সদস্যরা। নাম ও লোগোর এই আংশিক পরিবর্তন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংশয় এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’–এর প্রজ্ঞাপন গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে ২০০৪ সালে গঠিত র্যাবের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে আইনগতভাবে এসআরবি নামে বাহিনীটির সমস্ত কার্যক্রম শুরু হয়।
এসআরবি সদর দপ্তর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্র, প্রেস রিলিজ এবং অফিসিয়াল প্যাডে নতুন লোগো ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে ইংরেজি ‘RAB’ লেখার স্থলে ‘SRB’ বা ‘এসআরবি বাংলাদেশ’ যুক্ত করা হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, এসআরবি সদস্যরা এখনো র্যাবের পুরোনো মনোগ্রাম সংবলিত পোশাক পরিধান করছেন।
র্যাবের পরিবর্তে নতুন ব্র্যান্ডিং সত্ত্বেও পোশাকে পুরোনো চিহ্ন থেকে যাওয়ার বিষয়ে বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, এটি একটি 'রূপান্তরকালীন সময়'। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ ও সব আইনি ও লজিস্টিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগায় নতুন পোশাক সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান পোশাক পরিধান করা হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী বিলুপ্ত র্যাবের সমস্ত জনবল, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, অস্ত্র, ব্যাংক হিসাব এবং ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, গ্রেপ্তার ও তল্লাশির আইনি ক্ষমতা সরাসরি এসআরবির কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে সংসদে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বিরোধী দল ও বিরোধীদের অবস্থান: সংসদে এই আইন পাসের সময় আপত্তি তুলে দাবি করা হয় যে, পুরোনো কাঠামোগত ভিত্তি, একই জনবল ও সরঞ্জাম বহাল রেখে কেবল 'নাম ও সাইনবোর্ড' বদল করলে মূল কার্যপদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
বিগত আমলের প্রেক্ষাপট: ২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে অপরাধ দমনে গঠিত হলেও, পরবর্তী ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন কিংবা কক্সবাজারের কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো বাহিনীর ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর গঠিত গুমসংক্রান্ত কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্য বাহিনীর পেছনের দীর্ঘ কালো ছায়াকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্য মতে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে আসা গুমের অভিযোগগুলোর মধ্যে কমিশন যাচাইকৃত ৪০০টি ঘটনার মধ্যে ১৭২টি গুমের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি র্যাবের সম্পৃক্ততা পেয়েছে, যা যেকোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই পরিসংখ্যানের আলোকেই আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
র্যাবের এই পরিবর্তন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না জানান, র্যাবের সংস্কারে কোনো ফল আসবে না; এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য গঠিত হয়েছিল। বাহিনীটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করে সাধারণ পুলিশিং জোরদার করা উচিত।
মানবাধিকারকর্মী মনিরুজ্জামান ও আখতার হোসেনের মতে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার না থাকলে শুধু নাম বদলে কাজের ধরন পরিবর্তন হয় না। গুমের সর্বোচ্চ অভিযোগ পাওয়া বাহিনীকে পুনর্গঠনের বদলে বিলুপ্ত করাই যুক্তিসঙ্গত।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সম্পূর্ণ বিলুপ্তির চেয়ে কড়া আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অতীতে গুম ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অন্তত ৪৬৭টি কথিত 'বন্দুকযুদ্ধে' র্যাব জড়িত ছিল। ফলে মানুষের মনে তৈরি হওয়া ভয় ও আস্থার সংকট কেবল লোগোর আংশিক পরিবর্তন বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নাম বদলে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এসআরবি-কে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং মানবাধিকারমুখী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু দাপ্তরিক মোড়ক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ে পুরোনো মুখ ও পোশাকে সদস্যদের দেখে জনমনে যে আতঙ্ক কাজ করছে, তা দূর করতে হলে প্রয়োজন আচরণগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দৃশ্যমান প্রমাণ।
সরকারি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ বা অন্যান্য সংস্কারমূলক পদক্ষেপ মাঠে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে এসআরবির প্রতি সাধারণ মানুষের নতুন করে আস্থা ফেরার বিষয়টি।