ইসলামের দৃষ্টিতে কোন সময়ের স্বপ্ন সত্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি?

ঘুমের জন্য রাতকে সবচেয়ে উপযোগী সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তোমাদের বিশ্রামের জন্য নিদ্রা দিয়েছি। তোমাদের জন্য রাতকে করেছি আবরণস্বরূপ। দিনকে বানিয়েছি তোমাদের কাজের জন্য।’ (সুরা নাবা, আয়াত: ৯-১১)
ঘুমের মধ্যে মানুষ নানা ধরনের স্বপ্ন দেখে। কিছু স্বপ্ন মনে গভীর প্রভাব ফেলে, আবার কিছু ঘুম ভাঙার পরপরই ভুলে যায়। ইসলামে স্বপ্নের বিভিন্ন ধরন ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে সব স্বপ্নের অর্থ আছে কিংবা প্রতিটি স্বপ্ন ভবিষ্যতের কোনো ঘটনার ইঙ্গিত দেয়—এমন ধারণা সঠিক নয়।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) সত্য স্বপ্নকে নবুওয়তের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিনের স্বপ্ন নবুওয়তের ৪৬ ভাগের এক ভাগ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০১৮)
স্বপ্ন তিন ধরনের
ইসলামি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্বপ্ন সাধারণত তিন ধরনের। প্রথমত, আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা কল্যাণকর ইঙ্গিতবাহী স্বপ্ন। দ্বিতীয়ত, শয়তানের পক্ষ থেকে আসা ভয় ও মানসিক কষ্ট সৃষ্টিকারী দুঃস্বপ্ন। তৃতীয়ত, মানুষের দৈনন্দিন চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, ভয় কিংবা কল্পনার প্রতিফলন হিসেবে দেখা স্বপ্ন।
অর্থাৎ সব স্বপ্নকে একইভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে দুঃস্বপ্ন দেখে আতঙ্কিত হওয়া কিংবা প্রতিটি স্বপ্নের মধ্যে ভবিষ্যতের কোনো বার্তা খোঁজা থেকে বিরত থাকা উচিত।
কোন সময়ের স্বপ্ন বেশি সত্য হয়?
ইসলামি সূত্রে দিন-রাতের কোনো নির্দিষ্ট সময়কে একমাত্র সত্য স্বপ্ন দেখার সময় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। তবে কিছু হাদিসে বিশেষ পরিস্থিতিতে দেখা স্বপ্নের সত্য হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ রয়েছে।
১. দিন-রাতের সময় কাছাকাছি হলে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সময় যখন কাছাকাছি হবে, তখন মুসলিমের স্বপ্ন মিথ্যা হবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০১৯)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম বাগাভি (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু ইসলামি গ্রন্থে বসন্ত ও শরৎকালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য কাছাকাছি থাকে। তবে এ ব্যাখ্যাকে সব স্বপ্নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোনো চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
২. রাতের শেষ ভাগে দেখা স্বপ্ন
ইসলামি ব্যাখ্যাকারদের কেউ কেউ রাতের শেষ ভাগে দেখা স্বপ্নকে তুলনামূলকভাবে বেশি সত্য হওয়ার সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে জামে তিরমিজিতে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, ‘শেষ রাতের স্বপ্ন অধিক সত্য হয়।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২২৭৪)
তবে রাতের শেষ ভাগে দেখা প্রতিটি স্বপ্নই সত্য হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে ফজরের আগে বা পরে দেখা সব স্বপ্নেরও নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে, এমনটি বলা যায় না।
৩. কেয়ামতের সময় ঘনিয়ে এলে
জামে তিরমিজিতে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে, কেয়ামতের সময় ঘনিয়ে এলে মুমিনের স্বপ্ন খুব কমই মিথ্যা হবে। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২২৭০)
এ হাদিসের আলোকে ইসলামি আলোচনায় কেয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে মুমিনের সত্য স্বপ্নের প্রসঙ্গ উঠে আসে। তবে এটি ব্যক্তিগতভাবে কোনো স্বপ্নের সত্যতা যাচাই করার পদ্ধতি নয়।
শায়খ আহমাদুল্লাহর বক্তব্য
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঘুম হালকা থাকলে সে সময় দেখা স্বপ্ন সত্য হতে পারে। ফজরের আগে দেখা স্বপ্নও সত্য হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুঃস্বপ্ন ও অর্থহীন স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে, আর সত্য স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে।
তবে কোনো স্বপ্ন দেখে মনে গভীর প্রভাব পড়লেই সেটিকে নিশ্চিতভাবে সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। ইসলামে স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও ধর্মীয় বিধান, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ জীবনের সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে স্বপ্নকে গ্রহণ করার অবকাশ নেই।