জিয়াউর রহমানের পরিবেশনীতি: খাল খনন থেকে পানির অধিকার

বাংলাদেশের উন্নয়নচিত্রে এখন মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়ালসড়ক ও বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প দৃশ্যমান অগ্রগতির প্রতীক। কিন্তু এই উন্নয়নের সমান্তরালে নদী দখল, খাল ভরাট, জলাভূমি সংকুচিত হওয়া, বনভূমি হ্রাস, বায়ুদূষণ ও নগর জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট; কোথাও নদীভাঙন, কোথাও লবণাক্ততার বিস্তার—সব মিলিয়ে পরিবেশ এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এমন বাস্তবতায় স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নেওয়া খাল খনন, নদী পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ ও পানির অধিকারসংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। সত্তরের দশকের শেষভাগে এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। তখন জলবায়ু পরিবর্তন আজকের মতো আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে ছিল না। তবু পানি, মাটি, বন ও কৃষির পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নচিন্তার কিছু মৌলিক উপাদান পাওয়া যায়।
তবে অতীতের কোনো নীতিকে বর্তমানের সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়। বরং ঐতিহাসিক উদ্যোগগুলোর লক্ষ্য, অর্জন ও সীমাবদ্ধতা মূল্যায়ন করে আজকের বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সেগুলোর প্রাসঙ্গিক দিক কাজে লাগানোই গুরুত্বপূর্ণ।
খাল খনন: কৃষি, পানি সংরক্ষণ ও গ্রামীণ অর্থনীতির সংযোগ
১৯৭৭ সালে স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচির অংশ হিসেবে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক খাল খনন কার্যক্রম শুরু হয়। এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল কৃষিজমিতে সেচের সুযোগ বাড়ানো, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, স্থানীয় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। সে সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে সেচের সুযোগ বৃদ্ধি ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নকে উৎপাদন বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
খাল কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পানি প্রবাহিত করার পথ নয়। একটি কার্যকর খালব্যবস্থা বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনে সহায়তা করতে পারে, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেচ ও স্থানীয় জলাধারে পানির জোগান বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে। খাল, বিল, পুকুর ও নদীর মধ্যে সংযোগ বজায় থাকলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, জলজ প্রাণীর আবাস সংরক্ষণ এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতির স্বাভাবিক জলপ্রবাহ রক্ষার সুযোগ তৈরি হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের বহু শহর ও গ্রামীণ এলাকায় খাল ভরাট, দখল এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার পেছনে অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থার পাশাপাশি জলাধার ও প্রাকৃতিক প্রবাহপথ সংকুচিত হওয়ার ভূমিকা রয়েছে। খাল পুনরুদ্ধার তাই শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, বন্যা মোকাবিলা এবং জলবায়ু অভিযোজনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে পুরোনো খাল পুনঃখননের আগে শুধু মাটি সরানোর পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। খালের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্ত করা, দূষণের উৎস বন্ধ, পানি প্রবাহের সংযোগ ফিরিয়ে আনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় খননের কিছুদিন পরই পলি, বর্জ্য ও অবৈধ স্থাপনার কারণে খাল আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। জিয়ার সময়ের খাল খনন উদ্যোগের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা এখানেই—জনসম্পৃক্ততা ও পানি ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করা।
নদী পুনরুদ্ধার: শুধু খনন নয়, প্রবাহ ও প্রতিবেশ রক্ষা
বাংলাদেশের নদীগুলো দেশের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; কৃষি উৎপাদন, মাছের প্রজনন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং উপকূলীয় পরিবেশেও এর প্রভাব পড়ে।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নদী পুনঃখনন ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা আলোচিত হয়। তৎকালীন কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে নদী ও খালের নাব্যতা বজায় রাখা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নদী পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে আজ আরও বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। নদীর তলদেশ থেকে পলি অপসারণ কিছু ক্ষেত্রে প্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করলেও সব নদীর সমস্যার সমাধান শুধু খনন নয়। উজান থেকে পানির প্রবাহ, নদীর স্বাভাবিক বাঁক, প্লাবনভূমির বিস্তার, পলি পরিবহন এবং দুই তীরের ভূমি ব্যবহারের ধরনও বিবেচনায় নিতে হয়।
দেশের বহু নদী দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত বাঁধ, বালু উত্তোলন ও উজানের পানি প্রত্যাহারের মতো বিভিন্ন চাপে রয়েছে। কোথাও শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে যায়, কোথাও বর্ষায় নদীভাঙন তীব্র হয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় নদীভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। কোন নদীতে খনন প্রয়োজন, কোথায় দখল উচ্ছেদ জরুরি, কোথায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং কোথায় প্লাবনভূমি পুনরুদ্ধার প্রয়োজন—এসব সিদ্ধান্ত নিতে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা অপরিহার্য।
নদী ব্যবস্থাপনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। জেলে, কৃষক, নৌযানচালক ও নদীতীরবর্তী জনগোষ্ঠী নদীর পরিবর্তন সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রাখেন। তাঁদের অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নদী রক্ষার দায়িত্ব শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় সরকার, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ: জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তি
পরিবেশ সুরক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বৃক্ষরোপণ। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালুর বিষয়টি তাঁর পরিবেশসংক্রান্ত উদ্যোগের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়। গাছ মাটির ক্ষয় কমায়, কার্বন শোষণ করে, স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাস তৈরি করে। নদীতীর, পাহাড়, উপকূল ও নগর এলাকায় উপযুক্ত প্রজাতির গাছ লাগানো পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে বন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যার চাপ, বসতি সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ, অবৈধ গাছ কাটা ও ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক বন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বনভূমির পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবের মধ্যে সংজ্ঞা ও পরিমাপপদ্ধতিগত পার্থক্য থাকতে পারে। তাই বনভূমির প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নে বন আচ্ছাদন, প্রাকৃতিক বন, বৃক্ষ আচ্ছাদন এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের তথ্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে শুধু কতটি গাছ লাগানো হলো, তা দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করা যায় না। কতটি গাছ টিকে আছে, স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে প্রজাতিগুলো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সেগুলো জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কতটা ভূমিকা রাখছে—এসব সূচকও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক বনের জায়গায় একজাতীয় দ্রুতবর্ধনশীল গাছের বাগান তৈরি করলে তা সব ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বনভূমির সমতুল্য পরিবেশগত সুবিধা দেয় না।
বর্তমান বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বৃক্ষরোপণ ও বন পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা। উপকূলে ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়ে স্থানীয় প্রজাতির বন, নদীতীরে উপযোগী বৃক্ষ এবং শহরে ছায়াদানকারী গাছ সংরক্ষণে আলাদা কৌশল নিতে হবে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান বন রক্ষা এবং গাছের পরিচর্যা নিশ্চিত করাই হবে কার্যকর পরিবেশনীতির পরিচয়।
গঙ্গার পানি বণ্টন ও বাংলাদেশের পানির অধিকার
বাংলাদেশের পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনার আলোচনায় আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের প্রধান নদীগুলোর অনেকগুলোই আন্তসীমান্ত নদী। ফলে উজানের পানিপ্রবাহ, বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন এবং শুষ্ক মৌসুমের পানির প্রাপ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
১৯৭৭ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যা দুই দেশের পানি সম্পর্কের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই চুক্তির মেয়াদ ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয় পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। তাই একে বর্তমানের সব পানি সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা যায় না। তবে আন্তর্জাতিক আলোচনার মাধ্যমে পানির হিস্যা নির্ধারণ এবং অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরার ক্ষেত্রে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে।
পদ্মার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ কমে গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌচলাচল ও পরিবেশের ওপর চাপ বাড়তে পারে। নদীর প্রবাহ কমার সঙ্গে লবণাক্ততার বিস্তার, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা এবং মিঠাপানির বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের সম্পর্কও রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কূটনৈতিক আলোচনা, যৌথ নদী কমিশনের কার্যকর ভূমিকা, নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
গঙ্গা ব্যারেজের মতো বৃহৎ প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল হিসেবে পানি সংরক্ষণ, শুষ্ক মৌসুমে সেচের সুযোগ এবং প্রবাহ ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাব, পলি জমার ঝুঁকি, অর্থনৈতিক ব্যয়, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং আন্তসীমান্ত নদীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা জরুরি। প্রকল্পের নাম বা ঘোষণা নয়, বরং এর বাস্তব উপযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের বহুমাত্রিক ঝুঁকি
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, বিস্তৃত বদ্বীপ অঞ্চল এবং কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বহু মানুষের নির্ভরতা দেশটিকে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তাপপ্রবাহ—সবকিছুই মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শুধু দুর্যোগের সময় দৃশ্যমান হয় না। দীর্ঘমেয়াদে কৃষির উৎপাদনশীলতা, শ্রমিকের কর্মক্ষমতা, পানির প্রাপ্যতা, জনস্বাস্থ্য এবং অবকাঠামোর স্থায়িত্বও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত গরমে শ্রমঘণ্টা কমে যাওয়া, পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় এলাকায় মিঠাপানির সংকট মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ কারণে জলবায়ু মোকাবিলায় শুধু বাঁধ নির্মাণ বা দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়ার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। নদী ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, উপকূলীয় বন রক্ষা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে জিয়ার সময়কার পানি ব্যবস্থাপনা ও জনসম্পৃক্ত উন্নয়ন কর্মসূচির কিছু ধারণাগত মিল রয়েছে। তবে আধুনিক পরিকল্পনায় জলবায়ুবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক তথ্য ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করা অপরিহার্য।
বিএনপির পরিবেশ পরিকল্পনা: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের প্রশ্ন
বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনায় বিএনপির ঘোষিত পরিকল্পনায় নদী খনন, বৃক্ষরোপণ, পদ্মা ব্যারেজ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। দলটির ঘোষণায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী খনন ও ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মতো লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা, ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের প্রসার, উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
এসব লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বড় লক্ষ্য ঘোষণার সঙ্গে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সময়সীমা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, প্রকল্পভিত্তিক অগ্রাধিকার এবং নিয়মিত মূল্যায়ন। কত কিলোমিটার নদী খনন করা হলো বা কতটি গাছ লাগানো হলো—এমন পরিসংখ্যানের পাশাপাশি প্রকল্পের পর পানি প্রবাহ কতটা উন্নত হলো, বন্যা বা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কতটা কমল এবং গাছের কত শতাংশ টিকে রইল, সেসব তথ্যও প্রকাশ করা উচিত।
পরিবেশসংক্রান্ত প্রকল্পে স্বচ্ছতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নদী খনন ও বৃক্ষরোপণের নামে অর্থ অপচয়, নিম্নমানের কাজ কিংবা অনিয়ম হলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। প্রকল্প নির্বাচনের আগে পরিবেশগত সমীক্ষা, কাজ চলাকালে স্বাধীন তদারকি এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবেশনীতি কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক দায়িত্ব হতে পারে না। সরকার, বিরোধী দল, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষক, বেসরকারি সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে।
আধুনিক পরিবেশনীতিতে নতুন যে বিষয়গুলো জরুরি
জিয়াউর রহমানের সময়কার উদ্যোগগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও বর্তমান পরিবেশ সংকটের ধরন অনেক বিস্তৃত। এখন পানি ও বন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, টেকসই নগরায়ণ এবং জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নদী ও জলাভূমির দূষণ বাড়ায়। প্লাস্টিক ও অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য জলজ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শহরগুলোতে যানবাহন ও নির্মাণকাজের ধুলা বায়ুদূষণের বড় উৎস। এসব সমস্যা সমাধানে বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার, শিল্পবর্জ্য শোধন, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং নির্মাণকাজে পরিবেশগত নিয়ম কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পৃষ্ঠজলের নিরাপদ ব্যবহার এবং জলাভূমি রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা মানুষের সুপেয় পানির সংকট কমাতে পারে। কৃষিতেও পানি সাশ্রয়ী সেচপ্রযুক্তি, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার পদ্ধতি এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফসল নির্বাচন সহায়ক হতে পারে।
কার্বন ক্রেডিট ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের পরিবেশগত সুফল নির্ভরযোগ্যভাবে পরিমাপ, কার্বন হ্রাসের হিসাব যাচাই এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা জরুরি। শুধু সম্ভাব্য অর্থের হিসাব নয়, প্রকৃত পরিবেশগত ফলাফল ও জবাবদিহিই হতে হবে অগ্রাধিকার।
উন্নয়ন ও পরিবেশকে মুখোমুখি নয়, পাশাপাশি দেখতে হবে
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও আবাসন—সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি দরকার। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে নদী, জলাভূমি, বন বা কৃষিজমির অপূরণীয় ক্ষতি হলে দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য দিতে হয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষকে। তাই পরিবেশকে উন্নয়নের বাধা হিসেবে না দেখে টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
জিয়াউর রহমানের পরিবেশসংক্রান্ত উদ্যোগের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই যে, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, বৃক্ষরোপণ ও জনগণের অংশগ্রহণকে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এসব উদ্যোগের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করতে হলে সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও বিবেচনা করতে হবে। একইভাবে বর্তমানের যেকোনো রাজনৈতিক দলের পরিবেশ পরিকল্পনাকেও ঘোষণার ভিত্তিতে নয়, বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো—নদী ও খালকে কতটা জীবন্ত রাখা যাবে, বনভূমি কতটা সুরক্ষিত থাকবে, উপকূলীয় মানুষ নিরাপদ পানি পাবে কি না এবং নগর উন্নয়ন পরিবেশের ওপর চাপ না বাড়িয়ে কতটা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
জিয়ার পরিবেশনীতি নিয়ে আলোচনা তাই কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা খোঁজার একটি সুযোগ। অতীতের কার্যকর অভিজ্ঞতাকে আধুনিক বিজ্ঞান, পরিবেশগত ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশ আরও সহনশীল উন্নয়নের পথে এগোতে পারে। শেষ পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার সাফল্য নির্ধারিত হবে কতটি প্রকল্প ঘোষণা করা হলো, তা দিয়ে নয়; বরং কতটি নদী ও খাল পুনরুদ্ধার হলো, কতটা বন টিকে রইল, মানুষের পানির নিরাপত্তা কতটা বাড়ল এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবন কতটা সুরক্ষিত হলো—তার মাধ্যমে।