শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৫১২ বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার শঙ্কা, বাংলাদেশেও সতর্কতা জারি আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে: স্পিকার পাঁচ বছরের বেশি সময় পর মা অং সান সু চির সঙ্গে কথা বললেন ছেলে হোম ডেলিভারিতে মাদক, ঝুঁকিতে তরুণ প্রজন্ম সেনাবাহিনীর সহায়তায় খাগড়াছড়ি ফিরলেন সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকেরা আরব আমিরাতে বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব চোরাই ও ক্লোন ফোন বন্ধে দুই ধাপে এনইআইআর চালুর পরিকল্পনা বিটিআরসির বুকে ব্যথা নিয়ে সিসিইউতে ভর্তি মন্ত্রী মঈন খান এআই ও আধুনিক নিউজরুম কৌশলে দক্ষতা বাড়াতে খুলনায় সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ
  • মানসিক স্বাস্থ্য: নীরব সংকট মোকাবিলায় চাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা

    মানসিক স্বাস্থ্য: নীরব সংকট মোকাবিলায় চাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা
    ছবি: এআই
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    মানুষের সুস্থতা বলতে আমরা সাধারণত শারীরিক সুস্থতাকেই বুঝি। জ্বর হলে চিকিৎসকের কাছে যাই, শরীরে ব্যথা হলে ওষুধ খুঁজি, অসুস্থ হলে বিশ্রাম নিই। কিন্তু মনের ভেতরে জমে থাকা উদ্বেগ, হতাশা, ভয়, ক্লান্তি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপকে অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। কেউ নীরবে কষ্ট সহ্য করেন, কেউ সামাজিক সংকোচে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারেন না, আবার কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগই পান না। এভাবেই মানসিক স্বাস্থ্য বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের এক নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে।

    বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানসিক সুস্থতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অংশ। শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যেরও যত্ন প্রয়োজন। অথচ দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, চিকিৎসার সুযোগ, দক্ষ জনবল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

    জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এ ধরনের সমস্যার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা পান না। প্রকাশিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেন না। অর্থাৎ, সমস্যার ব্যাপকতার তুলনায় চিকিৎসা ও সহায়তার পরিধি অত্যন্ত সীমিত।

    এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথমেই প্রয়োজন মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে সমাজের প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা। মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হলেই কেউ অস্বাভাবিক বা অক্ষম হয়ে যান—এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল এবং সামাজিকভাবেও ক্ষতিকর। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কিংবা অন্য কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগলে সহানুভূতি, প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা দরকার। কাউকে উপহাস করা, দোষারোপ করা কিংবা তাঁর সমস্যাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

    চিকিৎসাসেবার ঘাটতি দূর করা জরুরি

    বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় বাধা হলো দক্ষ জনবলের সংকট। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও অন্যান্য প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে অধিকাংশ মানুষের জন্য সহজে ও সাশ্রয়ী মূল্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞ সেবার সুযোগও মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মানুষের ভোগান্তি বাড়ে।

    এই সংকট মোকাবিলায় শুধু বড় হাসপাতাল বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাথমিক পর্যায়ে মানসিক সমস্যার লক্ষণ শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত সেবার জন্য রোগীকে পাঠানোর সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে টেলিমেডিসিন ও অনলাইন পরামর্শসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

    স্বাস্থ্য বাজেটেও মানসিক স্বাস্থ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। সীমিত বরাদ্দ দিয়ে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা কঠিন। তাই প্রয়োজনভিত্তিক অর্থ বরাদ্দ, দক্ষ জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা জরুরি। তবে শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না; বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার এবং সেবার মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

    কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ আর উপেক্ষা নয়

    মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, অতিরিক্ত দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা এবং কাজের স্বীকৃতির অভাব মানুষের মানসিক সুস্থতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সাংবাদিক, শিক্ষক, পুলিশ সদস্য, চিকিৎসক, অগ্নিনির্বাপণকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে নিয়মিত চাপপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অথচ তাঁদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই নেই।

    সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এ সংকটের বিশেষ মাত্রা রয়েছে। সংবাদ সংগ্রহের অনিশ্চয়তা, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি, সময়সীমার চাপ, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা, বেতন-ভাতার অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত জীবনে সময় দেওয়ার সীমাবদ্ধতা সংবাদকর্মীদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। একইভাবে শিক্ষকদের প্রশাসনিক জটিলতা, সামাজিক প্রত্যাশা ও শ্রেণিকক্ষের চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়। পুলিশসহ সম্মুখসারির পেশাজীবীদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি ও সংকটের মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়।

    এ অবস্থায় কর্মীদের মানসিক সুস্থতাকে কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিয়োগকর্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। কর্মঘণ্টার বাস্তবসম্মত সীমা নির্ধারণ, ছুটি নিশ্চিত করা, হয়রানিমুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং গোপনীয়তা রক্ষা করে কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ চালু করা জরুরি। বড় প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলর নিয়োগ করা যেতে পারে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে কিংবা নির্ভরযোগ্য পেশাদার সেবাদাতার মাধ্যমে কর্মীদের সহায়তা দিতে পারে।

    শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যেও নজর দিতে হবে

    শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। পারিবারিক অশান্তি, পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার ফল নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা, সহপাঠীদের হয়রানি, অনলাইন জগতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা কিংবা একাকিত্ব তাদের মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এসব সমস্যার লক্ষণ অনেক সময় আচরণগত পরিবর্তন, মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা বা সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।

    তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে শিশুদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। শাসন বা দোষারোপের পরিবর্তে তাদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। মানসিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো সহায়তা দেওয়া সম্ভব।

    নির্ভরযোগ্য তথ্য ও গবেষণা ছাড়া পরিকল্পনা কার্যকর হবে না

    দেশে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে নিয়মিত জাতীয় জরিপ ও গবেষণা প্রয়োজন। আগের জরিপের তথ্য দিয়ে দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা চালিয়ে গেলে নতুন বাস্তবতা, ঝুঁকি ও প্রয়োজন যথাযথভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। করোনা মহামারির অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের চাপ, সামাজিক পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সংকট মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে কী প্রভাব ফেলেছে, তা তথ্যভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।

    নিয়মিত জরিপের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার, চিকিৎসার ব্যয়, অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য, শিশু-কিশোরদের প্রয়োজন এবং কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি, বাজেট নির্ধারণ এবং অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সমন্বিত করার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

    বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের তাৎপর্য কেবল একটি দিন আলোচনা বা প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এ উপলক্ষে গড়ে ওঠা সচেতনতাকে সারা বছরের কার্যক্রমে রূপ দিতে হবে। পরিবারে সহমর্মিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত অর্থ ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা—সবকিছুই একই উদ্যোগের অংশ।

    মনে রাখতে হবে, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষকে অবহেলা করলে শুধু একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন না; তাঁর পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজও এর প্রভাব বহন করে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা যেন অর্থ, অবস্থান কিংবা সামাজিক সংকোচের কারণে কারও নাগালের বাইরে না থাকে, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের লক্ষ্য।

    নীরব সংকট মোকাবিলার প্রথম পদক্ষেপ হলো সমস্যাকে স্বীকার করা; পরের পদক্ষেপ হলো সবার জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ভাঙতে পারলেই সুস্থ, মানবিক ও কর্মক্ষম সমাজ গড়ার পথ আরও সুগম হবে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ